সিলেটের পথে পথে—প্রকৃতির এক অনন্ত গল্প পর্ব ০১

Rafa Noman

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতা নিয়ে তুমুল বিশ্লেষণ চলছে। সব তালেবর তালেবর মানুষ। আমি পিছনে বসে শুনতেছি, আলোচনায় অংশগ্রহণ করার মতো যোগ্যতা আমার নাই।

 

সেই আলোচনায় এক ইন্টারেস্টিং বিষয় জানলাম, কবিগুরু নাকি কোনো কিছু লেখার আগে প্রচুর বই পড়তেন। এক টেবিলে বইয়ের স্তূপ থাকতো, আরেক টেবিলে লেখার খাতা। একটা একটা বই পড়তেন আর নিজের বইয়ের কিছু লাইন লিখতেন, আবার নতুন বই, আবার কিছু লাইন।

 

আমিও কদিন ধরে লিখছি, সেটা অবশ্য বই না। রোডম্যাপ। একসময় টুকটাক ঘুরতাম, সেটারই রোডম্যাপ। এই রোডম্যাপ লিখতে গিয়ে মাথার চুল ছিঁড়ে টাক হওয়ার উপক্রম হয়েছে আমার। কীভাবে শুরু করবো, এই লাইনই মাথায় আসে না। কবিগুরুর মতো বইয়ের স্তূপ নিয়ে পড়তে পড়তে হয়তো সহজ হতো বিষয়টা। কিন্তু এত ধৈর্য্য কি আর আমার আছে!

 

এই সমস্যার জন্য আমার আর রোডম্যাপ লেখা হয় না। আফসোস করতে করতে বছর শেষ হয়ে গেলো। বছরের শেষে এসে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা মিলে ঘুরতে যাবার পরিকল্পনা করছি। সব দায়িত্ব আমার, কারণ আমি নাকি ঘুরি! মান-সম্মান বাঁচাতে কোনো মতে একটা রোডপ্ল্যান করছি সিলেট যাবার।

 

সাত জনের বহর নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে রওনা দিব। বাসেই যেতে হবে। অনেকেই আবার চাকরি-বাকরি করে, ট্রেনের শিডিউল মেলানো কঠিন। সায়দাবাদ থেকে বাস রাত ১১টায়। এক বান্ধবী যাবার কথা থাকলেও সে যেতে পারছে না, যেতে না পারলেও পথে খাবার জন্য নুডলস বানিয়ে দিয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার হওয়া কিঞ্চিৎ জ্যাম ঠেলে ঢাকা থেকে বের হতে দেরি হয়ে গেছে। বন্ধুরা একসাথে হলে কি আর ঘুম হয়! খুচাখুচি চালিয়ে, পথে বিরতি দিয়ে, ভোর হবার আগে একটু ঘুমিয়েই আমাদের সিলেট ভ্রমণ শুরু।

 

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অপরূপ এক ভূখণ্ডের নাম সিলেট। পাহাড়ের সবুজ, চা-বাগানের সারি, হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি, ঝর্ণা, অসংখ্য নদী আর সুফি সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত এই অঞ্চলকে প্রকৃতি যেন নিজের হাতে সাজিয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনস্থল সিলেট।

 

সিলেট নামের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে একাধিক মত প্রচলিত। একটি মতে, প্রাচীন গৌড়ের রাজা গুহকের কন্যা শীলাদেবীর নামে প্রতিষ্ঠিত শীলাহাট থেকেই ‘সিলেট’ নামের উৎপত্তি। অন্য একটি মতে, হিন্দু পুরাণের শ্রীহট্ট নাম থেকেই বর্তমান ‘সিলেট’ নামের প্রচলন। আবার জনশ্রুতি রয়েছে, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ‘সিল হট্ যাহ্’ উচ্চারণ থেকেও এই নামের উৎপত্তি হতে পারে।

 

ঐতিহাসিকভাবে ১৭ মার্চ ১৭৭২ সালে সিলেট জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে নানা প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ১৯৯৫ সালে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই চার জেলা নিয়ে বর্তমান সিলেট বিভাগ গঠিত হয়।

 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। পাহাড়, চা-বাগান, নদ-নদী, টিলা, বনভূমি ও হাওর মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক অনন্য ভূপ্রকৃতি। প্রকৃতিপ্রেমী, ইতিহাস-অনুরাগী কিংবা ধর্মীয় পর্যটক—সবাইকে সমানভাবে আকৃষ্ট করে এই সবুজ জনপদ।

 

ক্বীন ব্রিজ ও হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার

 

শহরের কদমতলী বাস টার্মিনাল থেকে আমাদের প্রথম যাত্রা হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার। শহরের যে প্রান্তেই থাকেন, রিকশা কিংবা সিএনজিকে বললেই নিয়ে আসবে মাজার প্রাঙ্গণে। কদমতলী থেকে যে বাহনে আসবেন, আগেই বলে নেবেন ক্বীন ব্রিজে থামবেন।

ক্বীন ব্রিজ

মাজারে যাবার পথে সুরমা নদীর ওপর দিয়ে ক্বীন ব্রিজ হয়ে যেতে পারেন। তাতে ঐতিহাসিক ব্রিজটিও দেখা হবে।

 

১৯৩৩ সালে সুরমা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং নির্মাণ শেষে ১৯৩৬ সালে ব্রিজটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়। তৎকালীন আসাম সরকারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পাশাপাশি আব্দুল মজিদ কাপ্তান মিয়ারও এই ব্রিজ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।

 

সন্ধ্যায় ক্বীন ব্রিজের আশপাশ খুবই জমজমাট থাকে। তবু আমরা সকালেই ঘুরে দেখে মাজারের উদ্দেশ্যে যাচ্ছি।

 

সিলেটের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক স্থান। ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে ৩৬০ জন আউলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সিলেট বিজয়ের পর তিনি এখানে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের পাশাপাশি ইতিহাস ও সংস্কৃতিপ্রেমী দর্শনার্থীদেরও আকর্ষণ করে আসছে।

 

মাজার প্রাঙ্গণের অন্যতম আকর্ষণ চিল্লাখানা, যেখানে তিনি ইবাদত ও সাধনায় সময় কাটিয়েছিলেন। এছাড়া রয়েছে বিখ্যাত জালালী কবুতর, গজার মাছের পুকুর, ঐতিহাসিক কূপে সোনালী ও রূপালী মাছ এবং তাঁর ব্যবহৃত তলোয়ার ও খড়মসহ বিভিন্ন নিদর্শন। পাশে রয়েছে বড় বড় পাতিল (ডেগ), যেগুলোতে দান করা হয়। মাজার গেট দিয়ে ঢুকতেই সুবিশাল মসজিদ দেখা যায়।

মাজারের পিছনে রয়েছে কবরস্থান। স্থানীয় মানুষ ও তাঁর সঙ্গীদের অনেককে এখানে দাফন করা হয়েছে। এর মধ্যে মহানায়ক সালমান শাহকেও এখানে দাফন করা হয়।

শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার

ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার সিলেট ভ্রমণের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকালে নাশতা ও মাজার জিয়ারত করে অপরূপ সিলেট ঘুরতে বের হতে পারেন।

 

পুরো সিলেট জেলা এক বা দুই দিনে ঘুরে দেখা সম্ভব নয়। আমার এই রোডম্যাপটি মূলত বিশেষ বিশেষ জায়গাগুলো ধরে করা।

 

হযরত শাহ পরান (রহ.)-এর মাজার

 

হযরত শাহজালালের মাজার থেকে বের হয়ে আমাদের পরের গন্তব্য আরেক সাধক পুরুষ হযরত শাহ পরান (রহ.)-এর মাজার। অটো বা সিএনজিতে যাওয়া যায় মাজারের নিচ পর্যন্ত। তারপর সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় মাজারে।

 

শাহ পরান (রহ.) ছিলেন শাহজালাল (রহ.)-এর আপন ভাগিনা। তাঁরা একসঙ্গে সিলেটে এসে ধর্ম প্রচার করেন। পরবর্তীতে শাহজালাল (রহ.)-এর নির্দেশে খাদিমনগর টিলার ওপর শাহ পরান (রহ.) আস্তানা করেন এবং সেখান থেকেই ধর্ম প্রচার শুরু করেন।

 

সিলেটে ভালোভাবে ঘুরতে হলে কয়েকজন মিলে একটা সিএনজি ভাড়া করে একদিনের জন্য বের হলে ভালো হয়। তাতে সময় ও টাকা দুটোই সাশ্রয় হয়। শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের আশপাশ কিংবা শাহ পরান (রহ.)-এর মাজারের আশপাশ থেকে সিএনজি নিয়ে আমাদের পরের গন্তব্য লালাখাল।

 

লালাখাল

 

লালাখাল সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় অবস্থিত। স্বচ্ছ নীল ও পান্না সবুজ জল, পাহাড়, বন আর চা-বাগানের জন্য জায়গাটি বিখ্যাত। সিলেট শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ৩৫ থেকে ৪৪ কিলোমিটার। শহর থেকে সারীঘাট হয়ে লালাখাল পৌঁছে নৌকা বা স্পিডবোটে জিরো পয়েন্টের দিকে যাওয়া যায়।

লালাখাল

আমরা সাতজন হওয়ায় লেগুনা সারাদিনের জন্য রিজার্ভ করেছিলাম। লালাখাল পৌঁছে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে গেলাম খালের সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

 

জৈন্তিয়া পাহাড়ের ঠিক নিচে পাহাড়, প্রাকৃতিক বন, চা-বাগান ও নদীঘেরা লালাখাল। লালাখাল থেকে সারীঘাট পর্যন্ত নদীর পানির রঙ পান্না সবুজ হয়ে থাকে বিশেষ করে শীতকালে ও বৃষ্টি না হলে। নদীর বালুময় তলদেশ এবং পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির বৈশিষ্ট্যের কারণেই পানির এই অপূর্ব রঙ দেখা যায়।

লালাখাল

খালে পৌঁছানোর পর মনে হয় প্রকৃতি যেন তার সবচেয়ে সুন্দর রূপটি যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছে। স্বচ্ছ নীল-সবুজ পানির ওপর নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে চলে। দুই তীরে সারি সারি সবুজ পাহাড়, ঘন বন আর চা-বাগান মিলে তৈরি করে এক অপার্থিব দৃশ্য। আকাশের সাদা মেঘ পানিতে নিজেদের প্রতিচ্ছবি আঁকে, আর হালকা বাতাসে নদীর ঢেউ যেন নীরবে কোনো অজানা গল্প শোনায়।

 

চারদিকে পাখির ডাক, গাছের পাতার মৃদু শব্দ আর লালাখালের শান্ত স্রোত—সব মিলিয়ে এমন এক প্রশান্তি, যেখানে শহরের কোলাহল মুহূর্তেই হারিয়ে যায়।

 

লালাখাল থেকে জাফলং

 

লালাখাল থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য সিলেটের সবচেয়ে পরিচিত দর্শনীয় জায়গা জাফলং। আমাদের রিজার্ভ করা লেগুনাতে ফিরে সারীঘাট হয়ে জাফলং যাচ্ছি। পথে চা-বাগান আর সবুজের ঘনবন আমাদের ক্লান্তি দূর করছে। ইচ্ছে হলে যে কোনো বাগানের পাশে নেমে কিছু সময় কাটিয়ে আসতে পারেন।

জাফলং

সিলেটে ঘুরতে এসে কিছু জিনিস মাথায় রাখা উচিত। সিএনজি বা যে কোনো গাড়ি ঠিক করার আগে ভালো করে দরদাম করে কোথায় কোথায় যাবেন, কত সময় থাকতে পারেন—সব ঠিক করে নেওয়া উচিত। মাজারের সামনে থেকে গাড়ি কিছুটা দাম বেশি নেবে, তাই পথে কিংবা যে কোনো স্ট্যান্ড থেকে নিতে পারেন। মানুষ বেশি হলে লেগুনা নিতে পারেন।

 

আর যে কোনো জায়গায় লোকাল ফটোগ্রাফার দিয়ে ছবি তুলতে চাইলে আগেই ঠিকঠাক করে নেবেন, না হলে পরে ঝগড়া হয়।

 

জাফলং পৌঁছতে প্রায় বিকেল হতে চললো। পথে সুবিধামতো কোনো জায়গায় দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে পারেন।

 

জাফলং সিলেট শহর থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে গোয়াইনঘাট উপজেলায় ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত। খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথর, ওপারে ডাউকি পাহাড়ের ঝর্ণা আর সবুজ অরণ্যের মেলবন্ধন একে বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটন আকর্ষণে পরিণত করেছে।

 

পৃথিবীর কিছু কিছু সৌন্দর্য দূর থেকে দেখার জন্য নয়, তার ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার জন্য। জাফলং তেমনই একটি স্থান। এখানে এসে মনে হয়, প্রকৃতি যেন মানুষের সঙ্গে কথা বলে—শব্দে নয়, নীরবতায়।

জাফলং

পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলে নৌকা ভেসে চলে ধীরে। জলের নিচে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য পাথর রোদের আলোয় ঝিকমিক করে। নদীর ওপারে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়, পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা সরু জলধারা, আর মাঝেমধ্যে ভেসে আসা সাদা মেঘ—সব মিলিয়ে মনে হয়, প্রকৃতি আজ নিজের সবচেয়ে সুন্দর ছবিটি এঁকেছে।

 

জাফলং এসে খাসিয়া পুঞ্জিতে যেতে ভুলবেন না। সুপারি গাছের দীর্ঘ সারি, পানের বরজ, বাঁশের বেড়া আর ছোট ছোট ঘর—পাহাড়ের বুকের সঙ্গে মিশে আছে মানুষের সহজ জীবন। এখানে আধুনিকতার চেয়ে প্রকৃতির উপস্থিতিই বেশি অনুভূত হয়। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, পাতার ফাঁক দিয়ে আসা আলো, দূরের পাখির ডাক—সবকিছু মিলিয়ে পথটুকুও যেন গন্তব্যের চেয়ে কম সুন্দর নয়।

 

কিছু দূরে চোখ পড়তেই দেখা যায় ভারতের সেই ঝুলন্ত সেতু। এত কাছ থেকে আরেকটি দেশের মানুষ, পথ আর পাহাড়কে দেখা—অদ্ভুত এক অনুভূতি। মাঝখানে শুধু একটি নদী, অথচ আকাশ, বাতাস আর পাহাড়ের কোনো সীমান্ত নেই। সিলেটের এই দিকে আসলে পাহাড় দেখে আমাদের আফসোস হয়।

 

জাফলংয়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এর দৃশ্যে নয়, এর প্রশান্তিতে। এখানে এলে মনে হয়, জীবনের অযথা তাড়াহুড়ো একটু থেমে যায়। পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে, নদীর শব্দ শুনে যেতে ইচ্ছে করে, আর মনে হয়—প্রকৃতির কাছে ফিরে আসাই হয়তো মানুষের সবচেয়ে পুরোনো ঠিকানা।

 

পানি খুব বেশি না থাকায় আমরা খুব ভালো দৃশ্য পাইনি যদিও। সিলেট মূলত বর্ষায় সুন্দর, শুধু লালাখাল শীতে।

 

আমরা ঠিক সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সিলেট শহরে ফেরার পথ ধরেছি। ক্লান্ত থাকায় বেশিরভাগই ঘুমে। আজকের রাতে শহরেই থেকে পরদিন আমাদের সিলেটের দ্বিতীয় দিনের মতো ঘোরাঘুরি শুরুর কথা।

 

সিলেট শহর

 

সিলেট শহরেও কিছু জায়গা আছে দেখার মতো। সময় পেলে অবশ্যই যাওয়া উচিত। যেমন শহরের প্রাণকেন্দ্র নাওয়রপুলের ওসমানী জাদুঘর। খোদ সিলেটের অনেকেই এই জাদুঘরটির খোঁজ জানেন না। আমি বেশ কয়েকবার সিলেটে আসার পর এখানে যাওয়া হয়েছে।

 

ওসমানী জাদুঘর সিলেট জেলার কোতোয়ালী থানায় অবস্থিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর পৈতৃক নিবাসকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই জায়গায় দাঁড়ালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক গল্প যেন নীরবে অনুভব করা যায়।

ওসমানী জাদুঘর

শহরের কাছে টিলাগড় পেরিয়ে মেজরটিলার দিকে খাদিমপাড়ার কাছে বিশাল পাম বাগান আছে। সুযোগ পেলে অবশ্যই যাবেন। মাটির রাস্তা দিয়ে যেতে হয়, সাদা পাহাড় পেরিয়ে, ঝিরিপথ পার হয়ে টিলার ওপর পাম বাগান।

সাদা পাহাড়

চারপাশে যতদূর চোখ যায়, শুধু সবুজ। উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পামগাছের সারি, টিলার গায়ে বুনো ঘাস, পায়ের নিচে মাটির পথ আর কোথাও কোথাও ঝিরির শব্দ—সব মিলিয়ে জায়গাটাকে মনে হয় শহর থেকে লুকিয়ে থাকা কোনো এক টুকরো নির্জন পৃথিবী। সময় সুযোগ পেলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (SUST) সিলেট শহরের কুমারগাঁও এলাকায় ঘুরে আসতে পারেন

পাম বাগান

আমার অনেক অনেক আফসোসের মাঝে একটা হলো প্রকৃতির বর্ণনা ঠিকমতো দিতে না পারা। এই যে পাম বাগানের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে আছি, অথচ সেই মুগ্ধতাটুকু শব্দে প্রকাশ করতে পারছি না। কিছু সৌন্দর্য আসলে ছবিতেও ধরা পড়ে না, লেখাতেও না। শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখতে হয়। সিলেট শহরে থাকলে অবশ্যই সময় করে দেখে আসবেন।

 

সারাদিন ঘুরে রাতে চাইলে জৈন্তিয়া হিল রিসোর্টে থাকতে পারেন। আর সিলেট শহরে রাত্রিযাপন করলে অবশ্যই বিখ্যাত খাবারের হোটেল পাঁচ ভাই কিংবা পানসিতে খেতে পারেন।

 

 

বাস/ট্রেন থেকে নামার পর প্রথম দিনে সিলেটে ক্বীন ব্রিজ → হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার → হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার → লালাখাল → জাফলং ঘুরে শহরে ফিরতে পারেন।

 

রাতের খাবার খেয়ে সারাদিনের তোলা ছবি নিয়ে আমাদের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কে কোন ছবি তুলেছে, কার ছবিটা ভালো, কোনটা পোস্ট করা হবে—সব নিয়ে তুমুল আলোচনা। আমি সবার যুদ্ধ দেখছি, আর মনে মনে অন্য একটা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে আমার।

 

আজ থেকে কয়েক বছর পর এদের অনেকের সাথেই হয়তো আমার আর যোগাযোগ থাকবে না। কারও সঙ্গে হয়তো বছরের পর বছর দেখা হবে না। আজ যাদের সঙ্গে একই গাড়িতে বসে হাসছি, গল্প করছি, ছবি নিয়ে ঝগড়া করছি—কয়েক বছর পর তাদের কারও জীবন হয়তো অন্য শহরে, অন্য ব্যস্ততায়, অন্য মানুষের ভিড়ে আটকে যাবে। আমরাও হয়তো বদলে যাবো।

 

আমি জানি, এটাই জীবন। কিছু মানুষ আসে, কিছু সময়কে সুন্দর করে দিয়ে আবার নিজেদের মতো করে দূরে চলে যায়। কিন্তু আজকের এই রাতটা, এই হাসি, এই ক্লান্তি, এই একসঙ্গে বসে ছবি বাছাই করার ছোট্ট আনন্দ—হয়তো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।

 

সময় খুব অদ্ভুত জিনিস। আমরা যখন একসঙ্গে থাকার মুহূর্তগুলো পার করছি, তখন বুঝতেই পারি না—এগুলোর কোনো কোনোটা আসলে বিদায়ের আগের শেষ আনন্দ।

 

হয়তো অনেক যুগ পরেও আমরা কেউ মনে করতে পারবো না, সেই রাতে কে কোন ছবি নিয়ে ঝগড়া করেছিল। কিন্তু আমার মনে থাকবে—একটা সময় আমরা সাতজন মানুষ ছিলাম, একসঙ্গে একটা শহরে ঘুরেছিলাম, একই আকাশের নিচে হেসেছিলাম, ক্লান্ত হয়েছিলাম, আর জানতাম না যে সময় খুব নিঃশব্দে আমাদের আলাদা করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

 

এপ্রিল ২০১৯

বিঃদ্রঃ ঘুরতে গিয়ে কোথাও ময়লা ফেলবেন না এবং স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করুন।

{{ reviewsTotal }}{{ options.labels.singularReviewCountLabel }}
{{ reviewsTotal }}{{ options.labels.pluralReviewCountLabel }}
{{ options.labels.newReviewButton }}
{{ userData.canReview.message }}

Hi, I'm Rafa

Welcome to my world of exploration! I’m a passionate travel blogger from Bangladesh, dedicated to showcasing the incredible beauty and rich culture of my homeland.

Find us on Facebook