টাঙ্গাইলের পথে প্রান্তরে
রাহুল সাংকৃত্যায়নের ভবঘুরে শাস্ত্র পড়ছিলাম। ভবঘুরেদের জন্য লেখা এই বইয়ে ভবঘুরেদের তিনটি শ্রেণির কথা বলা হয়েছে,প্রথম,দ্বিতীয় ও তৃতীয়। আমি অবশ্য নিজেকে তৃতীয় শ্রেণির ভবঘুরেই মনে করি। কারণ প্রথম শ্রেণির ভবঘুরে হতে গেলে হাজার খানেক দ্বিতীয় শ্রেণির ভবঘুরে প্রয়োজন, আর দ্বিতীয় শ্রেণির ভবঘুরে হতে গেলে দরকার কয়েক হাজার তৃতীয় শ্রেণির ভবঘুরে। আমি কোন শ্রেণির, যাক সে কথা।
বইটির একটি অধ্যায় খুব গভীরভাবে মনে দাগ কেটেছে। সেখানে বলা হয়েছে, একজন সত্যিকারের ভবঘুরের সবচেয়ে বড় বাধা হলো প্রেম। ভবঘুরে হতে হলে জীবনকে খরস্রোতা নদীর মতো বহমান রাখতে হয়—যে নদী থেমে থাকে না, কোনো বাঁধ মানে না। পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে বেড়ানোই তার ধর্ম। আর সেই প্রবাহে সবচেয়ে বড় বাঁধ হয়ে দাঁড়ায় প্রেম।
এই প্রেম শুধু নর-নারীর প্রেম নয়; পরিবার, দায়িত্ব, মায়া—সবই এর অংশ। তরুণ বয়সে যারা ভবঘুরে হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাদের অনেকের পথ থেমে যায় এই বন্ধনের কাছেই। কোনো এক জনপদে ঘুরতে ঘুরতে হয়তো কারও প্রতি ভালো লাগা জন্ম নেয়, তারপর প্রেম, তারপর সংসার। তখন ভবঘুরের পথ আর আগের মতো খোলা থাকে না। তাই ভবঘুরে শাস্ত্র-এ বলা হয়েছে, “স্বাধীন মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এই প্রেমে নিহিত।”
আমাদের মতো তৃতীয় শ্রেণির ভবঘুরেরা অবশ্য এতটা স্বাধীন নই। আমরা দায়িত্ব, সময় আর বাস্তবতার বাঁধন পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারি না। তাই আমাদের ভ্রমণও সীমাবদ্ধ থাকে সপ্তাহের ছুটি কিংবা মাসে দু-একবার ছোট ছোট যাত্রায়। আর সেইসব স্বল্প সময়ের ঘোরাঘুরিকে সহজ ও সুন্দর করে তুলতেই আমার এই রোডম্যাপ।
এক বা দুই দিনের ভ্রমণের জন্য ঢাকার আশপাশের জেলাগুলো দারুণ উপযোগী। খুব ভোরে রওনা হয়ে, কিংবা রাতের যাত্রা শেষে গন্তব্যে পৌঁছে, দিনভর ঘুরে আবার নিজের শহরে ফিরে আসা—আমাদের মতো ভবঘুরেদের জন্য এটাই হয়তো সবচেয়ে বাস্তব আর সুন্দর ভ্রমণের গল্প।
এই তৃতীয় শ্রেণির ভবঘুরেদের জন্য এবারের গন্তব্য ঢাকার পাশের টাঙ্গাইল জেলা। ঢাকা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই জেলা, যেখানে ভাওয়ালের পাহাড়ি বন এসে মিলেছে যমুনার বিস্তৃত জলরেখার সঙ্গে। এখানে যেমন দেখা মেলে গারো ও কোচ জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনধারা, তেমনি শতবর্ষী জমিদার বাড়িগুলো আজও মাথা উঁচু করে বহন করে চলেছে ইতিহাস আর সংস্কৃতির স্মৃতি।
পর্যটনের মানচিত্রে টাঙ্গাইল খুব বেশি আলোচিত না হলেও, গ্রামের শান্ত সৌন্দর্য, গভীর বন, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য এই জেলার আলাদা আবেদন রয়েছে। ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ থাকলে, কিংবা ঢাকার কাছাকাছি কোথাও এক-দুই দিনের ছোট্ট ভ্রমণের ইচ্ছা থাকলে, টাঙ্গাইল হতে পারে দারুণ একটি গন্তব্য।
আমাদের যাত্রা শুরু হচ্ছে ঢাকা থেকে। কারণ ভবঘুরেদের বড় একটি অংশের যাত্রার শুরু এখান থেকেই। আবার দেশের অন্যান্য বিভাগ থেকে যারা ঘুরতে বের হন, তাদের অনেকের পথও এসে মিশে যায় ঢাকায়। আর যারা টাঙ্গাইলের আশপাশের জেলাগুলোতে থাকেন, তারা তো যেকোনো দিক থেকেই এই জেলার পথে নেমে পড়তে পারেন।
আমি সবসময় বলি, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রা শুরু করলে দিনটাকে অনেক বড় পাওয়া যায়। ফলে ঘোরাঘুরিও হয় নির্ভার আর পরিপূর্ণভাবে। যাদের হাতে এক বা দুই দিন সময় আছে, তারা খুব ভোরে ঢাকার মহাখালী থেকে টাঙ্গাইলগামী বিনিময়, নিরালা কিংবা ধলেশ্বরী বাসে উঠে মির্জাপুর উপজেলার নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে নেমে যেতে পারেন। আমাদের প্রথম গন্তব্য মহেরা জমিদার বাড়ি।
নাটিয়াপাড়া থেকে সিএনজি কিংবা অটোরিকশায় অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় মহেরা জমিদার বাড়িতে। উত্তরবঙ্গ থেকেও যারা আসবেন, তারা ঢাকাগামী যেকোনো বাসে নাটিয়াপাড়ায় নেমে একইভাবে যেতে পারবেন। নির্দিষ্ট ফি দিয়ে টিকিট কেটে ঢুকে পড়ুন ইতিহাস, স্থাপত্য আর হারিয়ে যাওয়া জমিদারি ঐতিহ্যের এক অনন্য জগতে।

মহেরা জমিদার বাড়ি
১৮৯০ সালের দিকে কলকাতার কালিচরণ সাহা ও আনন্দ সাহা এ অঞ্চলে এসে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এরও পূর্বে, স্পেনের করডোভা নগরীর আদলে জমিদার বাড়িটির মূল নকশা ও স্থাপত্য গড়ে তোলা হয়েছিল বলে জানা যায়। জমিদার বাড়িটি মূলত কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন ভবন, পুকুর, বাগান ও খোলা প্রাঙ্গণ নিয়ে গড়ে ওঠা একটি বিশাল কমপ্লেক্স। এখানে চৌধুরী লজ, মহারাজ লজ, আনন্দ লজ ও কালিচরণ লজসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। স্থাপনাগুলোতে ইউরোপীয় ও মুঘল স্থাপত্যশৈলীর মিশ্র প্রভাব দেখা যায়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী মহেরা জমিদার বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় জমিদার বাড়ির কূলবধূসহ পাঁচজন গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে পাকবাহিনী লৌহজং নদীর নৌপথে এলাকা ত্যাগ করে। পরে এখানে মুক্তিবাহিনীর একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

মহেরা জমিদার বাড়ি
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জমিদার বাড়িটিকে পুলিশ ট্রেনিং স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে এটিকে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশ এটি পরিচালনা করে এবং এটি টাঙ্গাইলের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
মহেড়া জমিদার বাড়ি ঘুরে দেখার পর আমাদের পরবর্তী গন্তব্য চারশত বছরের ঐতিহ্যবাহী করোটিয়া জমিদার বাড়ি। মহেড়া থেকে প্রথমে নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে ফিরে আসতে হবে। সেখান থেকে টাঙ্গাইলগামী বাসে উঠে করোটিয়া বাইপাসে নামতে হবে। এরপর বাইপাস থেকে অটো বা রিকশাযোগে খুব সহজেই পৌঁছে যাওয়া যাবে ঐতিহাসিক করোটিয়া জমিদার বাড়িতে।

করোটিয়া জমিদার বাড়ি
আফগান অধিপতি সোলায়মান খান পন্নী কররানির পুত্র বায়েজিদ খান পন্নী ভারতে আগমন করেন। পরবর্তীতে তাঁর ছেলে সাঈদ খান পন্নী আটিয়ায় বসতি স্থাপন করেন এবং ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে নির্মাণ করেন বিখ্যাত আতিয়া মসজিদ। পরে এই বংশেরই একাদশ পুরুষ সা’দত আলী খান পন্নী টাঙ্গাইলের করটিয়ায় এসে পন্নী বংশের জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। ‘আটিয়ার চাঁদ’ নামে খ্যাত ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ছিলেন এই বংশের শেষ জমিদার।
মোগল ও চৈনিক স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণে নির্মিত করটিয়া জমিদার বাড়িটি মূলত দুটি প্রধান ভবন নিয়ে গড়ে উঠেছে। এর প্রধান ভবনের নাম ‘মাসুদ ভিলা’, যা ১৮৯৯ সালে নির্মিত হয়। উঁচু বাংলো আকৃতির দ্বিতল এই ভবনটির ছাদ ও সামনের বারান্দা করুগেটেড লোহার পাত দিয়ে তৈরি, যা স্থাপনাটিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রার সৌন্দর্য।

করোটিয়া জমিদার বাড়ি
মাসুদ ভিলার ঠিক পেছনেই রয়েছে একতলা আরেকটি ভবন ‘রোকেয়া মঞ্জিল’। জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর স্ত্রী রোকেয়ার নামে ভবনটির নামকরণ করা হয়। বর্তমানে ভবনটি একটি স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় জমিদার বাড়ির ভিতরে আপাতত ঢুকা যাচ্ছে না,অনুমতি পাওয়া কঠিন। অনুমতি নিতে পারলে ঘুরতে আসতে পারেন না হয় স্কুল আশেপাশে ঘুরে আসতে পারেন। আমি সবসময় বলি আমার শুধু ভালো মানুষের সাথে পরিচয় এক বন্ধুর সহযোগিতা বাইরে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল এই বাড়িটি।
করটিয়া জমিদার বাড়ি থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা—আতিয়া মসজিদ। করটিয়ার জমিদার কর্তৃক নির্মিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি সময়ের সাক্ষী হয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী, টেরাকোটার নকশা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
টাঙ্গাইল গেলে অবশ্যই ঘুরে আসবেন ঐতিহ্যবাহী করটিয়া হাটে। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই হাট দেশের অন্যতম বৃহৎ কাপড়ের বাজার, যেখানে টাঙ্গাইলের বিখ্যাত তাঁতের শাড়ি, জামদানি ও বেনারসি তুলনামূলক সুলভ দামে পাওয়া যায়। প্রতি মঙ্গলবার ও বুধবার পাইকারি হাট বসে, আর বাকি দিন চলে খুচরা বেচাকেনা।
টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা শাড়ি, যার উৎপত্তি টাঙ্গাইলেই। ২০২৪ সালে এটি বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিরা এই শিল্পের প্রসার ঘটান। বর্তমানে হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের তাঁতিরাই এই ঐতিহ্যকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে চলেছেন।
করোটিয়া জমিদার বাড়ি থেকে বের হয়ে সময় বাঁচাতে চাইলে সরাসরি বাইপাসে ফিরে যেতে পারেন। আবার চাইলে করোটিয়া থেকেই কোনো লোকাল বাহন রিজার্ভ করে ঘুরে আসতে পারেন। এতে যাতায়াত আরও সহজ ও দ্রুত হবে।
আর হাতে যদি একটু বেশি সময় থাকে, তাহলে করোটিয়া থেকে টাঙ্গাইল পুরাতন বাস টার্মিনালে চলে আসুন। সেখান থেকে বটতলা পর্যন্ত লোকাল সিএনজি নিতে হবে। এরপর বটতলা থেকে রিকশায় খুব সহজেই পৌঁছে যেতে পারবেন ঐতিহাসিক আতিয়া মসজিদে।
পঞ্চদশ শতকে এ অঞ্চলে আগমন করেন বিখ্যাত সুফি সাধক আদম শাহ বাবা কাশ্মিরী। তিনি এখানে বসবাস শুরু করেন এবং ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মাজার আজও আতিয়ায় অবস্থিত। জানা যায়, বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ ১৫৯৮ সালে তাঁকে আতিয়া এলাকার জায়গিরদার হিসেবে নিয়োগ দেন।

আতিয়া মসজিদ
তৎকালীন কররানী শাসক সোলায়মান কররানীর কাছ থেকে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয় নির্বাহের জন্য তিনি একটি বৃহৎ এলাকা বা মহাল ওয়াকফ হিসেবে লাভ করেন। ধারণা করা হয়, সেই দানকৃত ভূমি বা ‘আতা’ শব্দ থেকেই পরবর্তীতে এ অঞ্চলের নাম ‘আতিয়া’ হয়েছে।
শাহ বাবা কাশ্মিরীর পরামর্শে তাঁর প্রিয় ভক্ত সাঈদ খান পন্নীকে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর আতিয়া পরগণার শাসক হিসেবে নিয়োগ দেন। এই সাঈদ খান পন্নীই পরবর্তীতে করোটিয়ার বিখ্যাত পন্নী জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা হন। তিনি ১৬০৮ সালে নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক আতিয়া মসজিদ। মসজিদটির দেয়ালজুড়ে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন টেরাকোটার নকশা।
একসময় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মুদ্রিত ১০ টাকা মূল্যমানের নোটের এক পাশে আতিয়া মসজিদের ছবি স্থান পেয়েছিল, যা এ মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও বিশেষভাবে তুলে ধরে।
যদি দুই দিন সময় নিয়ে টাঙ্গাইল ঘুরতে চান, তাহলে আতিয়া মসজিদ থেকে কাছেই দেলদুয়ার উপজেলার ১৭শ শতকে নির্মিত পাকুল্লা জামে মসজিদ ঘুরে আসতে পারেন। ফেরার পথে সময় কম থাকলেও বিখ্যাত পোড়াবাড়ির চমচম খেতে ভুলবেন না।
আর যদি একদিনের জন্য ঘুরতে যান, তাহলে পুরো দিনজুড়ে এসব জায়গা ধীরেসুস্থে দেখে আসতে পারবেন। চাইলে উল্টো দিক থেকেও ভ্রমণ শুরু করতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে সারাদিন একটু বেশি দৌড়ঝাঁপ করতে হবে এবং বাড়তি কয়েকটা জমিদার বাড়ি দেখার সুযোগো পাবেন।
সেক্ষেত্রে ভোরে গাবতলী থেকে আরিচাগামী বাসে উঠে কালামপুর বাসস্ট্যান্ডে নেমে সেখান থেকে যেতে পারেন ঐতিহ্যবাহী পাকুটিয়া জমিদার বাড়িতে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিষ্ণুপুর অঞ্চল থেকে আগত রামকৃষ্ণ সাহা মণ্ডল পাকুটিয়ায় বসতি স্থাপন করেন এবং ইংরেজদের কাছ থেকে জমি কিনে জমিদারির সূচনা করেন। তাঁর বংশধর বৃন্দাবন চন্দ্রের তিন ছেলে— ব্রজেন্দ্র মোহন, উপেন্দ্র মোহন ও যোগেন্দ্র মোহনের মাধ্যমে জমিদারিটি তিন তরফে বিভক্ত হয়। প্রজাবান্ধব এই জমিদার পরিবার ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করে বিখ্যাত বিসিআরজি উচ্চ বিদ্যালয়। পাশ্চাত্য স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত পাকুটিয়া জমিদার বাড়ির তিনটি অট্টালিকা ও নাটমন্দির আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। দেশভাগের পর জমিদার বাড়ির সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হলে এখানে গড়ে ওঠে বিসিআরজি ডিগ্রি কলেজ।

পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি
পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি ঘুরে এরপর যেতে পারেন আরেকটি ঐতিহাসিক স্থাপনায়— নাগরপুর জমিদার বাড়ি, যা চৌধুরী বাড়ি নামেও পরিচিত। টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলায় অবস্থিত এই জমিদার বাড়িটি একসময় এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী জমিদার পরিবারের আবাসস্থল ছিল,যা এখন জৌলুস হারিয়েছে। পাকুটিয়া থেকে অটো রিকসায় যেতে পারেন এখানে।

নাগরপুর জমিদার বাড়ি
ঊনবিংশ শতাব্দীতে যদুনাথ চৌধুরীর হাত ধরে নাগরপুরে চৌধুরী বংশের জমিদারির সূচনা হয়। প্রায় ৫৪ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই জমিদার বাড়ি পরে উপেন্দ্র মোহন, জগদীন্দ্র মোহন ও শশাঙ্ক মোহন চৌধুরীর মাধ্যমে আরও বিস্তৃত হয়। উপেন্দ্র মোহনের ছেলে সতীশ চন্দ্র রায় চৌধুরী সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে “রায় বাহাদুর” উপাধি লাভ করেন। আর তাঁর ছোট ভাই সুরেশ চন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন সৌখিন ও ক্রীড়াপ্রেমী; তিনি ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারিদের একজন ছিলেন।
মোঘল ও পাশ্চাত্য স্থাপত্যরীতির মিশেলে নির্মিত এই জমিদার বাড়িতে ছিল নহবতখানা, রঙ্গমহল, চিড়িয়াখানা এবং শৈল্পিক ঘোড়ার দালান। শ্রাবণ মাসে ঝুলন দালানে আয়োজন হতো পূজা, নাটক ও যাত্রাপালার। দেশভাগের পর জমিদার বাড়ির সম্পত্তি সরকার অধিগ্রহণ করে এবং বর্তমানে মূল ভবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নাগরপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ।
এছাড়াও সময় ও সুযোগ থাকলে নাগরপুরের ধলেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত মোকনা জমিদার বাড়িতেও ঘুরে আসতে পারেন।
যাদের হাতে সময় কম কিংবা নিজস্ব বাহনে ঘুরতে চান, তারা ভোরের আলো ফোটার আগেই ঢাকা থেকে রওনা দিতে পারেন। গাবতলী হয়ে প্রথমে চলে যান পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে ঘুরে দেখতে পারেন নাগরপুর জমিদার বাড়ি, ঐতিহাসিক আতিয়া মসজিদ, করোটিয়া বাজার ও করোটিয়া জমিদার বাড়ি। এরপর দিনের শেষ গন্তব্য হতে পারে মহেড়া জমিদার বাড়ি। সবকিছু ঘুরে রাতেই আবার ঢাকায় ফেরা সম্ভব।
আর যদি একটু ধীরে–সুস্থে টাঙ্গাইল ঘুরতে চান, তাহলে টাঙ্গাইল শহরে রাতযাপন করে পরদিন নতুন উদ্যমে আবার ঘোরাঘুরি শুরু করতে পারেন। শহরের নিউ মার্কেট, ভিক্টোরিয়া রোড ও নতুন বাস টার্মিনাল এলাকার আশেপাশে বিভিন্ন মানের বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। এছাড়া সরকারি ডাকবাংলোতেও থাকার ব্যবস্থা আছে। একটু নিরিবিলি পরিবেশ চাইলে যমুনা সেতুর আশেপাশের রিসোর্টগুলোও ভালো একটি বিকল্প হতে পারে। কিংবা সারাদিন কাটিয়ে দিতে পারেন যমুনার চরগুলো ঘুরে, বর্ষার যমুনা ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যময়,শীতে মৃতপ্রায় নদী চাইলে হেটে পার হওয়া যায়!
পরদিন মূলত আমাদের যাত্রা মধুপুর বন। পুরো একটি দিন কাটানোর মতো অসাধারণ জায়গা এটি। তবে সকালটা শুরু করতে পারেন টাঙ্গাইলের বিখ্যাত জিআই পণ্য পোড়াবাড়ির চমচম দিয়ে। এ জন্য টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরের পোড়াবাড়িতে যেতে হবে। শহর থেকে সহজেই ইজিবাইক কিংবা সিএনজি করে পৌঁছে যাওয়া যায় সেখানে।
পথে পড়বে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর জন্মস্থান সন্তোষ। দুই পাশের মনোমুগ্ধকর গ্রামীণ দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে যাবেন পোড়াবাড়িতে। চাইলে সন্তোষের পুরোনো জমিদার বাড়িটিও ঘুরে দেখতে পারেন। ধলেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত এই অঞ্চলটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কাউকেই সহজেই মুগ্ধ করবে।
সেখান থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ২০১ গম্বুজ মসজিদ। টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার নগদা শিমলা ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গম্বুজবিশিষ্ট এবং দ্বিতীয় উচ্চতম মিনারসমৃদ্ধ মসজিদ হিসেবে পরিচিত। মসজিদটিতে রয়েছে ২০১টি গম্বুজ ও ৯টি মিনার। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়।
টাঙ্গাইল শহর থেকে লোকাল বাস কিংবা সিএনজিতে গোপালপুর উপজেলা সদরে পৌঁছে সেখান থেকে অটো বা রিকশায় সহজেই যেতে পারবেন মসজিদটিতে। সময় হাতে থাকলে গোপালপুরে হেমনগরে অবস্থিত পরীর দালান জমিদার বাড়িটিও ঘুরে দেখতে পারেন। এছাড়াও গোপালপুর পাশে টাঙ্গাইল এর শেষ উপজেলা ধনবাড়িতে ৭০০ বছরের পুরোনো ধনবাড়ি মসজিদ ঘুরে আসতে পারেন। আমরা ২০১ গম্বুজ মসজিদ থেকে মধুপুর ফিরছি।
গোপালপুর থেকে আমাদের পরবর্তী যাত্রা মধুপুর শালবনের পথে। ঢাকা থেকে মধুপুর যাওয়ার প্রধান মাধ্যম সড়কপথ। মহাখালী বাসস্টেশন থেকে বিনিময় ও শুভেচ্ছা পরিবহনের বাস নিয়মিত চলাচল করে। আর টাঙ্গাইল থেকে ময়মনসিংহগামী যেকোনো বাস বা যানবাহনে উঠে “মধুপুর জাতীয় উদ্যান” বললেই নামিয়ে দেবে।
হাজার বছরের প্রাচীন মধুপুর শালবন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বনভূমি। সুন্দরবন ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চলের পর এটি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক বন। গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জুড়ে বিস্তৃত এ বন স্থানীয়ভাবে মধুপুর গড় বা গজারি বন নামেও পরিচিত। ১৯৮২ সালে এটি জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়।
গজারি গাছের সমারোহ, বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য মধুপুর জাতীয় উদ্যান ভ্রমণপিপাসুদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এখানে মুখপোড়া হনুমান, চিত্রা হরিণ, বন্য শূকরসহ নানা প্রাণী ও অসংখ্য পাখির দেখা মেলে। বনের ভেতরে রয়েছে দোখলা পিকনিক স্পট, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, হরিণ প্রজনন কেন্দ্র ও রাত্রিযাপনের জন্য কটেজ। বিকেলে ময়মনসিংহ হয়ে কিংবা টাঙ্গাইল হয়ে ফিরতে পারেন নিজের গন্তব্যে। সুযোগ ও রাস্তা মিললে যমুনা সেতু হয়ে দেখে যেতে পারেন যে কোনো সময়।
মধুপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে রসুলপুর এলাকায় জাতীয় উদ্যানের প্রধান ফটক। ফটক পেরিয়ে গহিন বনের পথে এগোলে চোখে পড়ে শালগাছের সারি, রাবার বাগান ও আদিবাসী গারো পল্লী। এছাড়া গারো কালচারাল সেন্টার, পাহাড়ি গ্রাম, প্রাচীন দীঘি, মন্দির ও নানা দর্শনীয় স্থান মিলিয়ে মধুপুর প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক অনন্য স্থান।

মধুপুর বন
পুরো একটি দিন অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারেন শালবনের নিস্তব্ধ ছায়ায়—প্রকৃতি আর নিজের সঙ্গে না বলা হাজারো গল্পে হারিয়ে গিয়ে। সরু মাটির রাস্তায় দুই পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ঘন সবুজ গজারি গাছগুলো যেন এক অদৃশ্য ছাতা হয়ে আপনাকে আগলে রাখে। বাতাসে ভেসে আসে মাটির সোঁদা গন্ধ, পাখিদের ডাক আর পাতার মৃদু ঝিরঝির শব্দ। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, এখানে সময় যেন একটু ধীর হয়ে যায়—মনটা অজান্তেই শান্ত হয়ে আসে, আর প্রকৃতির গভীরে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া যায়।
গজারি আর বটগাছের গভীর ছায়ায় বসে হঠাৎ মনে হলো—মানুষের জন্ম তো এই পৃথিবীতে একবারই। তাই নিজেকে খুঁজে পাওয়ার, প্রকৃতির সঙ্গে গল্প করার, সব কোলাহল থেকে দূরে একটু নিজের মতো করে বেঁচে থাকার সুযোগগুলো হেলায় হারিয়ে ফেলা ঠিক নয়।
“হে আগামী দিনের ভবঘুরে, প্রস্তুত হও। অরণ্যের নিঃশব্দ পথ, গাছের ছায়া আর প্রকৃ%A
