মহুয়া-মলুয়ার দেশ ময়মনসিংহ

Rafa Noman

সন্ধ্যা দেখার জন্য আমার এক বন্ধু দীর্ঘদিনের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল। চাকরিটা তার দরকার ছিল না—এমন নয়। বরং বলা যায়, নিজের আত্মার সাথে যুদ্ধ করে সে পেরে উঠেনি।
আধুনিকভাবে বলতে গেলে, তার মনের সাথে পেরে ওঠেনি। তবে “মন” শব্দটা খুবই আধুনিক, তাই আমি আত্মাই বলি।

 

শুনেছি বেগ ভাই মাঝে মাঝে বলেন,”যেখানে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে, সেখানে কোনো না কোনোভাবে ক্ষয় শুরু হয়”। আত্মাকেও আমরা যেদিন থেকে “মন” বলা শুরু করলাম, সেদিন থেকেই আত্মা যেন একটু আধুনিক হয়ে গেল। গুলশান-বনানীর বড় বড় কর্পোরেট অফিসের তির্যক কাঁচের মতো—যেখানে সূর্যের আলো সরাসরি ঢোকে না, কেবল প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। আত্মার ক্ষেত্রেও হয়তো তাই—সরাসরি আত্মা আর নেই , তার প্রতিফলনটাকেই আমরা এখন “মন” বলে ডাকি।

 

চাকরি ছেড়ে বন্ধু আমার কাছে এসে খুব করে ধরল—একদিন সন্ধ্যা দেখতে যেতে হবে।
আমরা আয়োজন করে বের হয়ে পরলাম। গন্তব্য—একটা আধুনিকতাহীন গ্রাম; যেখানে এখনো মানুষ আসরের আজান শুনলেই ফসলের মাঠ থেকে ফিরে আসে, নেয়ে-খেয়ে সন্ধ্যার পরপরই ঘুমিয়ে পরে।

 

দিনান্তের আলোয় হেমন্তের পেকে আসা সোনালি ধানক্ষেত ঝলমল করছিল। সদ্য নামতে শুরু করা শিশিরের আধিপত্য ভেঙে সবুজ মাঠে তখনও ফুটবল কিংবা দাঁড়িয়াবান্ধা খেলায় মগ্ন কিছু ছেলেরা।

বাড়ি থেকে বের হয়ে প্যাডেল রিকশা পেলাম না। আধুনিকতার সুবিধা হিসেবে মোটরচালিত রিকশাতেই উঠলাম। গ্রামের পথে যেতে যেতে জন-অরণ্য ছেড়ে আমরা ধীরে ধীরে বৃক্ষঅরণ্যের দিকে এগোচ্ছিলাম।

 

হঠাৎ মনে হলো—কত শত গাছ, অথচ তাদের অধিকাংশের নামই আমরা জানি না। এই অজ্ঞতা থেকে একধরনের মৃদু দুঃখ জন্ম নিল।

আমার বন্ধুও আমার মতোই মেধাহীন—সেও গাছগুলোর নাম জানে না। আগেও দেখেছি হয়তো দু-একবার, কিন্তু মনে রাখতে পারিনি। তাই আত্মার উপর জোরাজুরি না করে আমরা নিজেরাই নাম দেওয়া শুরু করলাম। একটার নাম দিলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা, আরেকটা কালাপাহাড়। তারপর সাদা পাহাড়, নীল পাহাড়…

 

রিক্সার গতি বেশি। আধুনিক যান,গতি বেশি থাকবেই।
শেষ পর্যন্ত তাই নেমে গেলাম—হাঁটতেই ভালো লাগছিল।

 

হেঁটে হেঁটে বৃক্ষঅরণ্য দেখতে দেখতে সোনালি ধানক্ষেত পেরিয়ে লোকালয়ের দিকে এলাম। পুকুরের পানা-শৈবাল আর শামুক থেকে মুখ ফিরিয়ে পাতিহাঁসের দল তখন ঘরে ফিরছে। আমরা আকাশ যেখানে শেষ হয়ে গেছে বলে মনে হয়,সেই প্রান্তের দিকে হাঁটতে লাগলাম।

 

পথের শেষে একটা ছোট্ট নদী।
সেখানেই বসে পরলাম।

আমাদের ঠিক পিছনে ধানক্ষেতে একটা কাকতাড়ুয়া দাঁড়িয়ে ছিল। মাথায় একটা মাটির কলস। না ঘুমাতে ঘুমাতে মানুষের চোখ যেমন হয়ে যায়, তেমন নিস্তেজ চোখ। ছেঁড়া প্যান্ট, ছেঁড়া শার্ট—কঞ্চির মতো দুই হাত।

হঠাৎ মনে প্রশ্ন এলো—
“কাকতাড়ুয়া” নামটা কে দিয়েছিল?

 

কাক কি ধান খায়?
কাক কি জানে এর নাম কাকতাড়ুয়া?
জানলে কি সে কাকরাজের কাছে বিচার দিত?
আর কাকরাজ তখন কী করত?

এমন কত প্রশ্নই যে মাথায় আসে।

 

আমাদের দুজনেরই রোদ্দুর হওয়ার ইচ্ছে ছিল!

একুশ বছরের তরুণীর কপালে সূর্যের মত লাল টিপের  রোদ্দুর!  কিন্তু রোদ্দুর হলে তো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল কিংবা ম্যাজিস্ট্রেটের মতো ক্ষমতা থাকবে না।
তাই রোদ্দুর হতে চেয়েও আমাদের মত পৃথিবীর  অনেক মানুষ শেষ পর্যন্ত রোদ্দুর হতে পারে না।

 

রোদ্দুরের কথা ভাবতে ভাবতে,

রোদ্দুর হতে চেয়ে,
শেষ পর্যন্ত পদবী হয়ে যায়!

 

আমরা যে নদীর তীরে বসে আছি এটা পার হলেই ময়মনসিংহ  জেলা।  তাই হুট করে সিদ্ধান্ত নিলাম ময়মনসিংহ ঘুরতে যাবো কাল।পরদিন ভোরে দুইজন বের হয়ে গেছি। আমাদের পাশের উপজেলা নান্দাইল দিয়ে শুরু করতে যাচ্ছি।

 

হাওর,জঙ্গল আর মহিষের শিং—এই তিনেই একসময় পরিচিত ছিল বৃহত্তম ময়মনসিংহ জেলা। সময়ের সঙ্গে এটি ছয় জেলায় বিভক্ত হলেও এর গুরুত্ব কমেনি।

 

ময়মনসিংহের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। উত্তরে গারো পাহাড়, দক্ষিণে ভাওয়াল-মধুপুর বন, পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা এবং পূর্বে বিভিন্ন নদীর অববাহিকা।প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত এই অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বৃহত্তর ঢাকা ও ময়মনসিংহ মিলেই গঠিত ছিল প্রাচীন বঙ্গরাজ্য। মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসনের পর মুসলিম শাসন, মোগল, নবাবি, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলেও এ অঞ্চল প্রভাবিত হয়।

 

নামের উৎস নিয়ে মতভেদ থাকলেও নাসিরাবাদ, মিহমানশাহী ও মোমেসিংসহ বিভিন্ন নামে এ অঞ্চল পরিচিত ছিল। ধারণা করা হয়, আকবরের আমলের আগ থেকেই ‘ময়মনসিংহ’ নামটি প্রচলিত ছিল এবং জেলা প্রতিষ্ঠার সময় জমিদারদের আবেদনে এ নামই সরকারি স্বীকৃতি পায়।

 

ব্রহ্মপুত্র

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ বেশি দূরে না হওয়ায় চাইলে একদিনে ঘুরে আসা যায়, আবার একটু ভালো করে ঘুরতে চাইলে দুই দিনে ঘুরতে পারেন। ঢাকার মহাখালী থেকে বেশ কিছু বাস ও ট্রেন যায়। ভোরে রওনা দিয়ে ঘন্টা তিনেকের মাঝে পৌঁছে যেতে পারেন।

 

আমরা যেহেতু কিশোরগঞ্জ থেকে রওনা দিচ্ছি তাই এদিক থেকে আঠারোবাড়ি জমিদার বাড়ি ঘুরে ময়মনসিংহ যাবো। কিশোরগঞ্জ থেকে নান্দাইল চৌরাস্থা হয়ে আঠারোবাড়ি জমিদার বাড়ি। বাড়িটি বর্তমানে আঠারোবাড়ি কলেজের নিয়ন্ত্রণে আছে।

আঠারোবাড়ি জমিদার বাড়ি

এই আঠারোবাড়ি জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠিত হয় প্রায় ২৫০ শতকে। এই জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তনকারী হচ্ছেন দ্বীপ রায় চৌধুরী। দ্বীপ রায় মূলত যশোর জেলার বাসিন্দা ছিলেন। দ্বীপ রায় চৌধুরী যশোর জেলার একটি পরগনার জমিদার ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার শীবগঞ্জে এসে এই জমিদারি ক্রয় করেন। এই শীবগঞ্জের বর্তমান নামই আঠারোবাড়ি। দ্বীপ রায় চৌধুরী এখানে আসার সময় তার জমিদার বাড়ির কাজকর্ম করার জন্য আঠারোটি হিন্দু পরিবার নিয়ে আসেন এবং তাদেরকে বাড়ি করে দেন। যার কারণেই এই গ্রামের নাম পরবর্তীকালে আঠারোবাড়ি নামে পরিচিত হয়ে উঠে। দ্বীপ রায় চৌধুরীর জীবনাবসানের পর এই জমিদার বাড়ির জমিদারি পান তার পুত্র সম্ভুরায় চৌধুরী। কিন্তু তার কোনো পুত্র সন্তান হয়নি। তাই তিনি প্রমোদ রায় নামের এক ব্রাহ্মণকে এনে লালন-পালন করেন। পরে ব্রাহ্মণ প্রমোদ রায় চৌধুরীই এই জমিদার বাড়ির জমিদার হন।

আঠারোবাড়ি জমিদার বাড়ি

এই জমিদার বাড়ির জমিদার প্রমোদ রায় চৌধুরীর আমন্ত্রণে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই জমিদার বাড়িতে আগমন করেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারোবাড়ি জমিদারবাড়িতে আসেন।

 

আঠারোবাড়ি থেকে ঘুরে নান্দাইল চৌরাস্তা ফিরে বাসে বা সি এন জিতে চলে যেতে পারেন ময়মনসিংহ সদরে।

সদরে যাবার পথে আরেকটি জমিদার বাড়ি ঘুরে যেতে পারেন। কিশোরগঞ্জ – ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশেই রামগোপালপুর বাজার। গৌরিপুর উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়নে এই জমিদার বাড়ি। নান্দাইল থেকে  ময়মনসিংহগামী কিংবা ময়মনসিংহ থেকে নান্দাইলগামী যে কোন বাহনে উঠে রামগোপালপুর বাজারে নেমে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দিবে রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি।

রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি

রামগোপালপুরের জমিদার যোগেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর পুত্র শৌরীন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ১২৯৩ বঙ্গাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গৌরীপুর ও আশপাশের এলাকার জমিদারদের ইতিহাস নিয়ে ‘বারেন্দ্রবাহ্মণ জমিদার’ গ্রন্থ রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। ধারণা করা হয়, রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি ১৮৫০ সালের দিকে নির্মিত হয়েছিল। তবে জমিদারি বংশের মূল প্রতিষ্ঠাতার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। প্রায় দেড়শ বছরের জমিদারি শাসনামলে রাজকীয় আভিজাত্য থাকলেও,১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় অধিকাংশ জমিদার দেশত্যাগ করেন। এরপর পরিচর্যার অভাবে জমিদার বাড়ির জৌলুস ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে।

 

এককালে জমিদার বাড়ির বাগানবাড়ি, চিড়িয়াখানা, রঙ্গমঞ্চ, সাগরদিঘি, নকশাকৃত পুকুর ঘাট এবং তিনতলা বিশিষ্ট তোরণ ছিল। এখন কেবল ধ্বংসপ্রাপ্ত দেয়াল,দু’টি প্রবেশদ্বার, এবং একটি মন্দির অবশিষ্ট আছে, যেখানে এখনও পূজা-অর্চনা হয়।

 

রামগোপালপুর থেকে ময়মনসিংহ সদরে পৌঁছে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ‘শশীলজ’। সদরের যে কোনো জায়গা থেকে অটো রিক্সা কে বললেই নিয়ে যাবে। শশীলজ শহরের মাঝখানে অবস্থিত।

শশীলজ

সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর শাসনামলে ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী জনপদে যুক্ত হলো সোনালি মাত্রা। প্রায় ৪১ বছর জমিদারি পরিচালনার প্রশস্ত প্রেক্ষাপটে বহু জনহিতকর কাজ করেন তিনি। ময়মনসিংহে স্থাপন করেন একাধিক নান্দনিক স্থাপনা। উনবিংশ শতকের শেষদিকে ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রস্থলে, ৯ একর জমির ওপর একটি অসাধারণ দ্বিতল ভবন নির্মাণ করলেন সূর্যকান্ত। নিঃসন্তান সূর্যকান্তের দত্তক পুত্র শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামে এই ভবনের নাম রাখা হলো ‘শশীলজ’।

 

শশীলজের মূল ফটকে রয়েছে ১৬টি গম্বুজ। ভেতরে প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছে ছাদ থেকে ঝুলন্ত, প্রায় একই রকম দেখতে—ঝাড়বাতি। সাধারণ বাসভবন ছাড়াও বাড়িটিতে আছে নাচঘর, স্নানঘর। স্নানঘরে রয়েছে একটি সুড়ঙ্গ। ধারণা করা হয়, এই সুড়ঙ্গপথে মুক্তাগাছা যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। মূল ভবনের পেছনভাগেও রয়েছে একটি স্নানঘর। ভবনটির পেছনে রয়েছে একচিলতে উঠোন। সবুজ ঘাসের আঁচল পাতা সেই উঠোন পেরোলে একটি অপরিসর জলাশয়।

শশীলজ

জলাশয়ের পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে দুটি জরাজীর্ণ ঘাট থাকলেও দক্ষিণ প্রান্তে দ্বিতল স্নানঘাটটির সৌন্দর্য সত্যিকার অর্থেই অসাধারণ। পিছনের স্নানঘরটি দোতলা। এই স্নানঘরে বসে রানী পাশের পুকুরে হাঁসের খেলা দেখতেন। পুকুরটির ঘাট মার্বেল পাথরে বাঁধানো।

 

শশীলজের মূল ভবনের সামনে রয়েছে বাগান। সেই বাগানের মাঝখানে আছে শ্বেতপাথরের ফোয়ারা, যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে গ্রিক দেবী ভেনাসের স্বল্পবসনা স্নানরতা মর্মর মূর্তি। বাগানের ঠিক পেছনেই লালচে ইট আর হলুদ দেয়ালে নির্মিত শশীলজ। এর পাশেই রয়েছে পদ্মবাগান।

 

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর স্নানঘরটির সংস্কার করেছে, করেছে সাদা রং। শশীলজকে বর্তমানে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। এই জাদুঘরটি বেশ সমৃদ্ধশালী।

 

শশীলজ থেকে বের হলেই একটু দূরে  ময়মনসিংহ নগরের ঐতিহাসিক স্থাপনার একটি ‘আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল’। স্থানীয়ভাবে এটা ‘লোহার কুঠি’ নামে পরিচিত। ময়মনসিংহ জেলা প্রতিষ্ঠার শতবার্ষিকী উপলক্ষে ১৮৮৯ সালে প্রাসাদটি নির্মাণ করা হয়। ময়মনসিংহ জেলা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৮৭ সালের ১ মে। প্রাসাদটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ৪৫ হাজার টাকা।

প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন তৎকালীন জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী।

আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল

তৎকালীন ভারত সম্রাট সপ্তম অ্যাডওয়ার্ডের স্ত্রী আলেকজান্দ্রার নামানুসারে এর নামকরণ হয় ‘আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল’। ভবন নির্মাণে লোহার ব্যবহার থাকায় স্থানীয়ভাবে এটি ‘লোহার কুঠি’ নামে পরিচিতি পায়। বর্তমানে প্রাসাদটি ময়মনসিংহ শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ১৩৬ বছরের পুরোনো ভবনটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।

আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল থেকে বের হয়ে একটু হাঁটলেই কিংবা রিক্সাতে যেতে পারেন বিপিন পার্ক।

প্রায় ২০০ বছর আগে নির্মিত এই পার্কটি ময়মনসিংহের সর্বপ্রাচীন পার্ক। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে এই পার্কে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের একাধিক সভা এখানে অনুষ্ঠিত হয়। ভাষা আন্দোলন ছাড়াও পরে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সভা-সমাবেশ বিপিন পার্কে অনুষ্ঠিত হত। দেশের স্বাধীনতার পর পার্কটিতে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ কমে আসতে থাকে।

২০১৩ সালে কংগ্রেস জুবিলি রোডে ‘থিমপার্ক’ হিসেবে পার্কটি সংস্কার করে পুনর্নির্মাণ করা হয়।

বিপিন পার্কে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ঝর্ণা, বিভিন্ন স্থাপনা, ফুলের বাগান, পায়ে হাঁটা পথ, সীমানা প্রাচীর ও বসার বেঞ্চ। ব্রহ্মপুত্র নদ বিধৌত এ পার্কটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন অসংখ্য দর্শনার্থী। ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে বিরাজমান এই পার্কটি।

ময়মনসিংহ শহর বেশ পুরোনো, সময় পেলে রিক্সা  নিয়ে ঘুরতে পারেন। ব্রহ্মপুত্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।

পছন্দমত যেকোনো হোটেল দেখে দুপুরের খাবার খেয়ে বের হয়ে যেতে পারেন পরের গন্তব্যে। ময়মনসিংহ শহর থেকে আমাদের পরের গন্তব্য মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি। ময়মনসিংহ বাইপাস কিংবা টাঙ্গাইল গামী যে কোন বাস বা সি এন জিতে যেতে হবে মুক্তাগাছা সদরে, সেখানে পৌছে জমিদার বাড়ি বললে অটো বা রিকসা নিয়ে যাবে।

 

মুক্তাগাছা শহরের গোড়াপত্তন করেন জমিদার আচার্য চৌধুরী বংশ। এই বংশই প্রথম এখানে বসতি স্থাপন করে এবং ধীরে ধীরে এলাকাটিকে একটি জনপদে রূপ দেয়।

মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি

এই বংশের প্রথম পুরুষ ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী, যার আদি নিবাস ছিল বগুড়া। তিনি মুর্শিদাবাদের নবাবের দরবারে রাজস্ব বিভাগে কর্মরত ছিলেন এবং নবাবের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেই সময়, বাংলা সনের ১১৩২ সালে, তিনি তৎকালীন আলাপসিং পরগনার বন্দোবস্ত গ্রহণ করেন।

 

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শ্রীকৃষ্ণ আচার্যের চার পুত্র—রামরাম, হররাম, বিষ্ণুরাম ও শিবরাম বগুড়া ছেড়ে আলাপসিং পরগনায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। বসতি স্থাপনের পূর্বে তারা বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন এবং শেষ পর্যন্ত বর্তমান মুক্তাগাছা এলাকাকে বেছে নেন।

মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি

সে সময় এই অঞ্চল ছিল প্রায় জনমানবশূন্য—চারদিকে ঘন অরণ্য ও জলাভূমি। তারা ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা আয়মান নদীর তীরে নৌকা ভিড়িয়ে বসতি স্থাপন শুরু করেন। এখান থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মুক্তাগাছার জনপদ।

 

শ্রীকৃষ্ণ আচার্যের মেজো পুত্র হররাম আচার্য চৌধুরী মুক্তাগাছা জমিদারির অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার বাসভবনই বর্তমানে পরিচিত রাজবাড়ি হিসেবে।

এই বংশের জমিদাররা “আটানি বাড়ির জমিদার” নামেও পরিচিত ছিলেন।

 

মুক্তাগাছার জমিদারির মোট ১৬টি অংশ। ১৬ জন জমিদার এখানে শাসন করতেন। মুক্তাগাছা রাজবাড়িটির প্রবেশমুখে রয়েছে বিশাল ফটক। প্রায় ১০০ একর জায়গার ওপর নির্মিত এই রাজবাড়িটি প্রাচীন স্থাপনাশৈলীর অনন্য নিদর্শন।

 

রাজ বাড়িটিতে একটি ঘূর্ণায়মান নাট্যমঞ্চ আছে।

বাড়ির মাঝভাগ থেকে চোখে পড়ে  অনেকগুলো ভাঙা ঘর। এ দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয় হারিয়ে যাওয়া জমিদারি প্রথার কথা। ভেতরের অংশে মন্দিরসহ অনেক গোপন কক্ষ ছিল যা এখনো চিহ্ন আছে।

 

জমিদার বাড়ির পাশেই রয়েছে ২০০ বছরের পুরোনো বিখ্যাত মুক্তাগাছার মন্ডার দোকান।১৮২৪ সালে এই মিষ্টির প্রচলন হয়। এটির প্রস্তুতপ্রণালী মণ্ডার আবিষ্কারক গোপাল পালের বংশধরদের দ্বারা প্রকাশ করা হয়নি। এই মন্ডাকে ২০২৪ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকার দ্বারা ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

 

কথিত আছে ১২৩১ বঙ্গাব্দে (১৮২৪ খ্রিঃ) রাম গোপাল পাল স্বপ্নে মিষ্টি তৈরির রেসিপি পান। তিনি এই মিষ্টি তৈরি করে মুক্তাগাছার বড় জমিদারদের  মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর কাছে পেশ করেন। বর্তমানে গোপাল পাল পরিবারের পঞ্চম বংশধর শ্রী রামেন্দ্রনাথ পাল ভ্রাতৃদ্বয় এই মিষ্টির ব্যবসা পরিচালনা করেন। রামেন্দ্রনাথ বলেন, জমিদার বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক এবং আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। সেখানে আগত অতিথিদের মন্ডা দিয়েই আপ্যায়ন করা হতো।

 

মুক্তাগাছা থেকে  প্রিয়জনের জন্য মন্ডা নিয়ে ময়মনসিংহ শহর হয়ে ফিরতে পারেন ঢাকায় কিংবা আপনার গন্তব্যে। অথবা ময়মনসিংহ শহরে থেকে পরদিন যেতে পারেন ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ে। শহরের চরপাড়া, স্টেশন রোড,ফায়ার সার্ভিস মোড়,ট্রাঙ্ক রোড,গাঙ্গিনার পাড় বেশ কিছু হোটেল আছে  দেখেশুনে উঠে যেতে পারেন।

হাতে সময় থাকলে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শহরের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা,গৌরিপুর লজ,ময়মনসিংহ জাদুঘরে ঢু মেরে আসতে পারেন।

একদিন থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট। এই অঞ্চলে  বাস করে দালু, বানাই, মান্দাই,গারো, হাজং, কোচ প্রভৃতি খুদে- জনগোষ্ঠী।

 

ময়মনসিংহ শহরের ব্রিজ থেকে হালুয়াঘাটের বাস চলে ঘণ্টা খানেকের পথ, হালুয়াঘাট বাজার নেমে  অটো বা বাইক নিয়ে যেতে পারেন গাবরাখালী পর্যটন স্পটে।

গাবরাখালী পর্যটন স্পট

হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলার গাবরাখালী ও গলইভাংগা গ্রাম।এই দুটি গ্রামে রয়েছে ময়মনসিংহের গারো পাহাড় নামে খ্যাত এর একাংশ। এর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করে সকল বয়সের মানুষকে। বাহিরের এলাকা থেকেও মানুষ আসে এই প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার জন্য। সমতল ভূমি পরিবেষ্টিত পাহাড়, পাখির কলরব আর সোনালি সূর্যের সূর্যাস্তক্ষণ দেখতে অনেক সুন্দর । ১২৫ একর এলাকা জুড়ে ছোট-বড় ৬৭টি পাহাড় নিয়ে গাবরাখালি পাহাড় গঠিত। পাহাড় গুলোর বিভিন্ন নাম আছে। যেমন- চিতাখলা টিলা, যশুর টিলা, মিতালী টিলা, বাতাসী টিলা ইত্যাদি।

গাবরাখালী পর্যটন স্পট

পাহাড়ের মাঝখানে নীচু জমি আছে পানিতে ভরে গেলে লেক মনে হবে। নীচু জমিগুলোতে বোরো মৌসুমে ভারত থেকে সরার পানি দিয়ে বোরো ধান আবাদ করা হয়।পাহাড়গুলোতে গজারি গাছ লাগানো হয়েছে।পূর্বে হাজং ও বানাই জনগোষ্ঠির বসবাস ছিল এ গাবরাখালি গ্রামে। এর উত্তরপ্রান্ত সংলগ্ন এলাকায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমানা। সন্ধ্যায় ভারতের সীমানার দিকে নীলাভ আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে বেশ সৌন্দর্যময়।

 

কয়েকদিন আগে গিয়েছিলাম হালুয়াঘাট।

মুরাদ ভাই,আবীর ও আমি ঘুরতে বের হয়ে গিয়েছিলাম ঐ অঞ্চলে আমাদের সবার প্রিয় জাহাঙ্গীর ভাইয়ের আমন্ত্রণে ওনার বাড়িতে।মেঘালয়ের পাহাড়ের নিচে একদম বর্ডার ঘেঁষে  বাড়ি, বাড়ির আঙিনার রাতের অন্ধকার তলিয়ে যায় বর্ডারের রঙিন আলোতে। বাড়ির পাশেই ঝিরি পথ। বর্ষার আনাগোনাতে আশেপাশে প্রচুর ছোট মাছের বসতি গড়ে উঠেছে । আমাদের  সকালের খাবার এই পাহাড়ি ছোট মাছ দিয়েই।

একদম বাংলাদেশ-ভারত বর্ডার ঘেষে আইলাতলী গ্রাম।হালুয়াঘাট সীমান্তের এই পাহাড়ি গ্রামটা যেন এক টুকরো শান্ত সবুজ পৃথিবী। ছোট ছোট টিলা, ভোরের কুয়াশা আর শিশিরভেজা ঘাসে চারপাশ সবসময়ই সজীব। পাহাড় থেকে নেমে আসা সরু ঝিরি পথগুলো টুপটাপ শব্দে বয়ে চলে, পাশে বুনো ফুল আর ঘন সবুজে ভরা প্রকৃতি।

 

গারো আদিবাসীদের ছোট ছোট ঘরগুলো টিলা আর সমতলের মিশ্রণে  ছড়িয়ে আছে, প্রকৃতির সাথেই যেন তাদের বসবাস। আর ঠিক পাশেই ভারতের মেঘালয়ের উঁচু পাহাড় দূর থেকে নীলচে আভায় ভাসে,বিকেলের আলোয় আরও সুন্দর লাগে। সব মিলিয়ে জায়গাটা নিস্তব্ধ,নির্মল আর একদম আপন।

 

আমরা এই বর্ডার ঘেষে ময়মনসিংহ থেকে নেত্রোকোনা যাছি হেঁটে।  আবীর, মুরাদ ভাই আর আমি আমাদের তিন জনের জন্য এই রাস্থা নতুন, এক পাশে মেঘালয়ের পাহাড় আরেক পাশে সমতল আর টিলার মিলনমেলা। রাস্থার কাজ চলছে তাই যানবাহন নেই বললেই চলে। স্থানীয় সংস্কৃতি আর চোখ শান্ত করার মত প্রকৃতি দেখে দেখে আমাদের হাঁটা চলছে….

 

বিঃদ্রঃ ঘুরতে গিয়ে কোথাও ময়লা ফেলবেন না এবং স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করুন।

 

 

জুন ২০২২

{{ reviewsTotal }}{{ options.labels.singularReviewCountLabel }}
{{ reviewsTotal }}{{ options.labels.pluralReviewCountLabel }}
{{ options.labels.newReviewButton }}
{{ userData.canReview.message }}

Hi, I'm Rafa

Welcome to my world of exploration! I’m a passionate travel blogger from Bangladesh, dedicated to showcasing the incredible beauty and rich culture of my homeland.

Find us on Facebook