প্রাচীন বিক্রমপুরে একদিন(মুন্সিগঞ্জ)

Rafa Noman

আজব গাঁয়ের আজব কথা সিনেমার দুঃখহরণ বাবুর কথা মনে আছে? উনার একটা লাইন আমার মাথায় খুব করে আটকে আছে। লাইনটা এমন—”পৃথিবী কত বিশাল, কত রকমের দেশ, কত রকমের মানুষ, কত রকমের ভাষা, কত রকমের গান, কত রকমের খাবার—এর কিছুই দেখা হলো না।”দুঃখহরণ বাবুর মত নিজের দেশের ভূগোলই জানা হলো না আমারও; অন্য দেশ তো পরের কথা। শুনেছি প্রতি ২৫–৩০ কিলোমিটার পর পর ভাষা কিছুটা হলেও পরিবর্তন হয়। সেই পরিবর্তন খুঁজতে বার বার ছুটে যেতে ইচ্ছে হয়।

কখনো সুযোগ হয়, কখনো হয় না। এই ভাষা কিংবা সংস্কৃতির পরিবর্তন খুঁজতেই আমি বার বার নিজের গণ্ডি ছেড়ে বের হতে চেষ্টা করি। এবার এক দিনের জন্য বের হয়েছি—ঢাকার খুব কাছেই শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর জন্মস্থান ও ‘গাছের প্রাণ আছে’ আবিষ্কার করা বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর অস্তিত্ব খুঁজতে মুন্সিগঞ্জে যাচ্ছি।

মুন্সিগঞ্জের প্রাচীন নাম বিক্রমপুর। চারদিকে ধলেশ্বরী, ইছামতি, পদ্মা, মেঘনা দিয়ে ঘেরা দ্বীপের মতো জেলা। সাথে আছেন লিংকন ভাই। লিংকন ভাই দারুণ মানুষ—ঘুরতে গিয়ে নিজের মন-মানসিকতার মতো মানুষ পেলে ঘুরাঘুরির আনন্দ আরও বেড়ে যায়।

ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জ কাছেই। গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ি, সায়েদাবাদ থেকে কিছুক্ষণ পর পর বাস ছেড়ে যায়। আমরা সকাল ৬টার বাস ধরেছি গুলিস্তান থেকে। সকালে বাস থেকে নেমে শহরের চিত্রামোড়ে চলে যাবেন বিক্রমপুরের বিখ্যাত সব মিষ্টি আর রুটি দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে ঘুরাঘুরি শুরু করতে পারেন।

মুন্সিগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রস্থল কোর্টের পাশেই ইন্দ্রকপুর কেল্লা কেল্লা অবস্থিত। আমাদের প্রথম গন্তব্য এথানেই। মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সেনাপতি ও বাংলার সুবেদার মীর জুমলা কর্তৃক ১৬৬০ সালে বিক্রমপুরের এই অঞ্চলে ইদ্রাকপুর কেল্লা নামে এই দুর্গটি নির্মিত হয়। সে সময় মগ জলদস্যু ও পর্তুগিজদের আক্রমণ থেকে এলাকাকে রক্ষা করার জন্য এই দুর্গটি নির্মিত হয়। জনশ্রুতি আছে—এ দুর্গের সাথে ঢাকার লালবাগের দূর্গের সুড়ঙ্গপথে যোগাযোগ ছিল। শত্রুদের উদ্দেশ্যে গোলা নিক্ষেপের জন্য দুর্গটির দেয়ালে অসংখ্য ছিদ্র রয়েছে।

ইন্দ্রকপুর কেল্লা

প্রাচীরঘেরা এই দুর্গটির চার কোণায় রয়েছে একটি করে গোলাকার বেষ্টনী। ১৯০৯ সালে এই দুর্গটি পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়। বহু উচ্চ প্রাচীরবেষ্টিত এই গোলাকার দুর্গটি এলাকায় এস.ডি.ও কুঠি হিসাবে পরিচিত।

ইন্দ্রকপুর কেল্লা

ইন্দ্রকপুর কেল্লা থেকে আমাদের পরের গন্তব্য বাবা আদম মসজিদে। কেল্লার সামনে থেকে রিকসা বা অটো তে মীরকাদেমের দর্গা বাড়ি বা বাবা আদম মসজিদ বললেই নিয়ে যাবে।

মুন্সীগঞ্জের বাবা আদম মসজিদ একটি ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। বাবা আদম নামে এক ব্যক্তি মধ্যপ্রাচ্য থেকে এখানে এসেছেন ইসলাম প্রচার করতে। তিনি এক যুদ্ধে মারা গেলেও পরে তাঁর স্মরণে সুলতান জালালুদ্দিন ফতেহ শাহের শাসনামলে মালিক কাফুর মসজিদটি নির্মাণ করেন।

বাবা আদম মসজিদ

বাবা আদমের মসজিদ থেকে আমাদের পরের গন্তব্য শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর জন্মস্থান বজ্রজোগিনী গ্রামে।মসজিদের  সামনে থেকে কিংবা সদরের যে কোনও জায়গা থেকে রিকশা বা অটো নিয়ে যেতে পারেন বজ্রজোগিনী গ্রামের পণ্ডিত ভিটাতে।

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হলেন একজন প্রখ্যাত পণ্ডিত, যিনি পাল সাম্রাজ্যের আমলে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং বৌদ্ধধর্ম প্রচারক ছিলেন।

মহামহোপাধ্যায় সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ ও রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, পালযুগে মগধের পূর্ব সীমান্তবর্তী প্রদেশ অঙ্গদেশের পূর্ব প্রান্তের সামন্তরাজ্য সহোর, যা বর্তমানে ভাগলপুর নামে পরিচিত, তার রাজধানী বিক্রমপুরীতে সামন্ত রাজা কল্যাণশ্রীর ঔরসে রাণী প্রভাবতী দেবীর গর্ভে ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে অতীশ দীপঙ্করের জন্ম হয়। তবে কিছু ঐতিহাসিকের মতে, তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত বিক্রমপুর পরগনার বজ্রজোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

অতীশ দীপঙ্কর স্মৃতি কমপ্লেক্স

তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মে সংস্কারের মতো শ্রমসাধ্য কাজ করতে করতে দীপঙ্করের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে ১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে ৭৩ বছর বয়সে তিব্বতের লাসা নগরের কাছে চে-থঙের দ্রোলমা লাখাং তারা মন্দিরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর স্মৃতিতে বজ্রজোগিনী গ্রামে অতীশ দীপঙ্কর স্মৃতি কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়েছে। কমপ্লেক্সে একটি মন্দির, জাদুঘর ও ভিক্ষুদের থাকার জায়গা রয়েছে।

বজ্রজোগিনী গ্রাম থেকে আমাদের পরের গন্তব্য শ্রীনগর উপজেলা। উপজেলা সদরে পৌঁছে অটো বা রিকশায় “বসু বাড়ি” বললেই পৌঁছে যাওয়া যাবে পরের গন্তব্যে।

বাংলাদেশের প্রথম সফল বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সমগ্র শিক্ষা জীবনের এক পর্যায়ে ১৮৮০ সালে চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে লন্ডন গমন করেন। কিন্তু তিনি পদার্থ, রসায়ন ও উদ্ভিদ শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে ১৮৮৪ সালে দেশে ফিরে আসেন। মহান এই বিজ্ঞানী জীবনে সকল সম্পদ বিজ্ঞানের উন্নয়নে দান করেছেন। ২০১১ সালে জগদীশ ইনস্টিটিউশনের উদ্যোগে জগদীশ চন্দ্র বসু কমপ্লেক্স স্থায়ী রূপ লাভ করে। ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর এই মহান কৃতিমান ব্যক্তির জীবনাবসান ঘটে।

বসু বাড়ি

জগদীশ চন্দ্র বসু ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী—যিনি রেডিও প্রযুক্তি থেকে শুরু করে উদ্ভিদের সংবেদনশীলতা পর্যন্ত বিশ্ববিজ্ঞানকে নতুন দিশা দেখিয়েছেন। রেডিও বিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক মারকোনির আগেই তিনি সফলভাবে বেতার সংকেত প্রেরণ করেন এবং মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপন করেন।

গাছের অনুভূতির প্রথম প্রমাণদাতা হিসেবে তাঁর আবিষ্কৃত ক্রেসকোগ্রাফ যন্ত্রের মাধ্যমে তিনি দেখান—গাছেরও অনুভূতি, প্রতিক্রিয়া ও জীবন আছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান সবার জন্য। তাই নিজের উদ্ভাবনের পেটেন্ট পর্যন্ত না নিয়ে জ্ঞানের দরজা উন্মুক্ত রেখেছিলেন সবার জন্য।

জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈত্রিক বসতবাড়িকে ঘিরে জগদীশ চন্দ্র বসু স্মৃতি জাদুঘর কমপ্লেক্স সাজানো হয়েছে। প্রায় ৩০ একর আয়তনের এই বাড়িতে অসংখ্য বৃক্ষরাজির ছায়াময় প্রকৃতির মাঝে বিভিন্ন পশু-পাখির মূর্তিলিপি, কৃত্রিম পাহাড়-ঝরনা, শান বাঁধানো ঘাট এবং দর্শনার্থীদের বিশ্রামাগার যেমন কাঠঘর নির্মাণ করা হয়েছে। জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে বসুর পোর্ট্রেট, বিভিন্ন গবেষণাপত্র, হাতে লেখা পান্ডুলিপি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তিতে লেখা চিঠি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাঠানো চিঠি এবং অনেক দুর্লভ ছবি প্রদর্শনের জন্য রাখা রয়েছে।

বসু বাড়ি থেকে বের হয়ে আমাদের পরের যাত্রা ভাগ্যকুল গ্রামে ভাগ্যকুল জমিদার বাড়িতে। বসু বাড়ির সামনে থেকে অটো বা রিকসা কিংবা হাতে সময় থাকলে গ্রামের সবুজ রাস্থা ধরে হেঁটে যেতে পারেন।

জমিদার যাদুনাথ সাহা আনুমানিক ১৯০০ শতকে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ভাগ্যকুল গ্রামে ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন।যাদুনাথ সাহা মূলত ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি বরিশাল থেকে লবণ, সুপারি, শাড়ি ইত্যাদি পণ্য আমদানি করে মুর্শিদাবাদে রপ্তানি করতেন। মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদার বাড়ির সাথে ভাগ্যকুল জমিদার বাড়িতে বেশ সাদৃশ্য রয়েছে।

ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ি

যাদুনাথ সাহা তাঁর ৫ ছেলে-মেয়ের জন্য পৃথক পৃথক বাড়ি নির্মাণ করে দেন। বাড়িগুলো স্থানীয় মানুষের কাছে কোকিলপেয়ারী জমিদার বাড়ি, উকিল বাড়ি, জজ বাড়ি এবং ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ি নামে পরিচিতি লাভ করে। এক বাড়ি হতে আরেক বাড়ির দূরত্ব ৪০ থেকে ৫০ গজ। তবে বাঁধুরায় অবস্থিত ভাগ্যকুল জমিদার বাড়িটি বর্তমানে অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় রয়েছে।

বিক্রমপুরের বিখ্যাত ভাগ্যকুল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এই ভাগ্যকুল বাজারেই অবস্থিত। সময় পেলে খেয়ে আসতে পারেন। দুপুরে পদ্মার মাছ দিয়ে যে কোনও বাজারেই খেতে পারেন।

হাতে সময় থাকলে আড়িয়াল বিল ঘুরে আসতে পারেন কিংবা একদিন সারাদিন ঘুরতে যেতে পারেন আড়িয়াল বিলে।

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে সাজানো আড়িয়াল বিলে ঋতুভেদে নতুন নতুন বৈচিত্রের প্রকাশ ঘটে। বর্ষাকালে সবুজে ঘেরা বিলের স্বচ্ছ পানিতে শাপলা, কচুরি পানার ফুল এবং নানা জাতের পাখির উপস্থিতি প্রকৃতিপ্রেমীদের মন কেড়ে নেয়। শীতকালে বিলের বুকে পানির স্তর কমে গিয়ে বিলের শুকনো মাটিতে শীতকালীন সবজির চাষ করা হয়। শাপলা তোলা, নৌকায় চড়ে মাছ ধরা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য ভ্রমণকারী সময় কাটাতে ছুটে আসেন।

মুন্সিগঞ্জে সকালে পৌঁছে চাইলে সারাদিনের জন্য অটো নিতে পারেন। এতে আরো অনেক পুরাকীর্তি যেমন ইন্দ্রকপুর কেল্লা, অতীশ দীপঙ্কর বাড়ি, ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ি, বাবা আদমের মসজিদ, নগর কসবা, সোনারং জোড়া মঠ, পোলাঘাট সেতু, শ্রীনাথ রায়ের বাড়ি, পদ্মহেম দাম সব কিছু ঘুরতে পারেন।

শ্রীনগর থেকে মাওয়া ঘাট কাছে পুরো মুন্সিগঞ্জ ঘুরার রোড প্ল্যানে শ্রীনগর দিনের শেষ অংশে রেখে সন্ধ্যায় মাওয়া এসে ইলিশ আর বেগুন ভাজা দিয়ে ভাত খেয়ে ঢাকা ফিরতে পারেন অথবা আপনার গন্তব্যে ফিরতে পারেন। চাইলে মুন্সিগঞ্জ থেকে লঞ্চে ফিরতে পারেন সদরঘাট।  মুন্সিগঞ্জ ও সদরঘাট থেকে থেকে সকাল দুপুর সন্ধ্যায় বেশ কিছু লঞ্চ চলাচল করে।

আমরা মাওয়া হয়ে ফিরছি। শীতের রাতে যখন সবাই বাসের জানালা বন্ধ করে দেয় আমি একটু ফাঁকা করে পিছনের সিটের যাত্রীর রক্তচোক্ষু উপেক্ষা করেই জানালার ছোট অংশ খুলে চলতে থাকলাম। হিম হাওয়া আর অঞ্জন দত্তের গান

“চলছে আমার রাস্তা,রাস্তা উদ্দেশ্যহীন

উড়িয়ে যাচ্ছে হাইওয়ে জুড়ে

আরও একটা দিন

আরও অনেক অনেক দূর পরের শহর

চলতে হবে আমায় রাত্রি ভোর

নেই যে আমার কোন অবসর

যদি খুঁজে পাওয়া যেত একটা ঘর।”

বিঃদ্রঃ ঘুরতে গিয়ে কোথাও ময়লা ফেলবেন না এবং স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করুন।

ডিসেম্বর-২০২০

{{ reviewsTotal }}{{ options.labels.singularReviewCountLabel }}
{{ reviewsTotal }}{{ options.labels.pluralReviewCountLabel }}
{{ options.labels.newReviewButton }}
{{ userData.canReview.message }}

Hi, I'm Rafa

Welcome to my world of exploration! I’m a passionate travel blogger from Bangladesh, dedicated to showcasing the incredible beauty and rich culture of my homeland.

Find us on Facebook