ঈশা খাঁর রাজধানী সোনারগাঁয়ে একদিন
স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেছে, হাঁসফাঁস লাগছে। কয়টা বাজে টাওর করতে পারছি না। ঘড়ি দেখতে তীব্র ইচ্ছে হলেও মোবাইলের চোখধাঁধানো আলোর দিকে তাকাতে একদম মন চাইতেছে না। কী স্বপ্ন দেখেছি মনে করতে পারছি না। মাঝে মাঝে এমন হয়—দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙলেও মনে করতে পারি না কী দেখেছি। দিন-দুনিয়া তখন এতোটাই বিষাদ লাগে! মনে হয় এই বুঝি ইসরাফিল (আ.) শিঙ্গায় ফুঁক দিলেন।
অনেকক্ষণ ঘুমের জন্য বৃথা চেষ্টা করেও ঘুম না আসাতে হতাশ হয়ে ফোনের বদখত আলোতেই চোখ বুলাতে হলো। ভোরের আলো ফুটার অপেক্ষা করছে, যে কোনো সময় উঁকি দিতে পারে। ঢাকায় আজ আর থাকতে মন চাইতেছে না। কিন্তু এত সকালে কোথায় যাবো? একা যেতেও মন চাইতেছে না। মাথায় আসলো সজল আর মারুফের কথা আমার দুই বন্ধু একসাথে কল্যাণপুর থাকে। সকালেই ফোন দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে আমরা বের হয়ে গেলাম পথে। গন্তব্য জানা নেই, পথে ঠিক করবো। গুলিস্তানের বাস পাওয়াতে এটাই আপাতত গন্তব্য। বাসে উঠে গন্তব্য ঠিক করতে যেয়ে দেখি পকেটে যে টাকা-পয়সা আছে তা দিয়ে বেশি দূর যাওয়া যাবে না। গুলিস্তান থেকে নারায়ণগঞ্জ কাছে হওয়াতে আমাদের গন্তব্য মধ্যযুগের বাংলার মুসলিম শাসকদের রাজধানী সোনারগাঁও।



গুলিস্তানে নাস্তা সেরে আমরা সোনারগাঁও বাসে উঠেছি। গুলিস্তান থেকে দোয়েল, স্বদেশ, বোরাক—বাস যায় নারায়ণগঞ্জ। সোনারগাঁও যেতে হলে আমাদের নামতে হবে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা। মোগরাপাড়া নেমে রিকশা তে পানাম নগর। প্রায় দেড় হাজার বছরের প্রাচীন শহর সোনারগাঁও ছিল বাংলার রাজধানী। মুসলিম শাসকদের অধীনে পূর্ববঙ্গের একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল সোনারগাঁও। ১৩ শতকের স্থানীয় হিন্দু রাজা দনুজ মাধব দশরথদেব সুবর্ণগ্রামকে তাঁর শাসনকেন্দ্র করেন।
বঙ্গ অঞ্চল মুসলিম শাসনে আসার পর থেকে ১৬১০ সালে ঢাকা সুবা বাংলার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সোনারগাঁ ছিল স্বাধীন সুলতানি বাংলার অন্যতম রাজধানী ও প্রশাসনকেন্দ্র। বাংলার ১২ ভূঁইয়ার অন্যতম ঈশা খাঁর রাজধানী ছিল এই সোনারগাঁয়ে।


১৭ শতকের প্রথম দশকে সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকায় স্থাপিত হওয়ার পর সোনারগাঁয়ের প্রশাসনিক গুরুত্ব কমতে থাকে। ১৯ শতকের শুরু থেকে হিন্দু বণিকদের একটি অংশ পানাম অঞ্চলে আবাসিক ভবন নির্মাণ করেন। প্রায় ৫ মিটার প্রশস্ত ও ৬০০ মিটার দীর্ঘ একটি সড়কের দুইপাশে সুরম্য স্থাপনা নিয়ে পানাম নগর গড়ে ওঠে। সড়কের দুইপাশে মুখোমুখি দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলাবিশিষ্ট ৫২টি ভবন রয়েছে।
ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের প্রতীক হয়ে উঠছে এই নগরের আশপাশের সর্দারবাড়ি, ঈশা খাঁর তোরণ, নীলকুঠি, বণিক বসতি, ঠাকুরবাড়ি ও পানাম নগর সেতু। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীলচাষের নির্মম ইতিহাসের নীরব সাক্ষী পানামের নীলকুঠি। পানাম পুলের কাছে দুলালপুর সড়কের পাশেই এর অবস্থান। এ ছাড়া আমিনপুর ও দুলালপুর গ্রামের সংযোগ রক্ষাকারী পানাম পুলটি পঙ্খীরাজ খালের ওপর ১৭ শতকে নির্মিত হয়। তিনটি খিলানের ওপর পুলটি স্থাপিত।



পানাম নগরের পাশেই ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সোনারগাঁয়ের পানাম নগরে একটি পুরনো বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন ও জাদুঘর। এখানে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের অবহেলিত গ্রাম-বাংলার নিরক্ষর শিল্পীদের হস্তশিল্প, জনজীবনের নিত্য ব্যবহার্য পণ্যসামগ্রী। এসব শিল্প-সামগ্রীতে তৎকালীন প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের রূপচিত্র প্রস্ফুটিত হয়।



তাছাড়া বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য—কাঠ এবং কাঠ থেকে বিভিন্ন কারুপণ্য তৈরি এবং সর্বশেষ বিক্রি পর্যন্ত সামগ্রিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে সুন্দর মডেল দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বাইরে রয়েছে পাঠাগার, ডকুমেন্টেশন সেন্টার, সেমিনার হল, ক্যান্টিন, কারুমঞ্চ, গ্রামীণ উদ্যান ও বিভিন্ন রকমের বৃক্ষ, মনোরম লেক, লেকের মাঝে ঘুরে বেড়ানোর জন্য নৌবিহার, মৎস্য শিকারের সুন্দর ব্যবস্থা ও পঙ্খীরাজ নৌকা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসে শিক্ষা সফরের ব্যবস্থাও রয়েছে।



লোকশিল্প জাদুঘর থেকে বের হয়ে আমাদের পরের গন্তব্য তাজমহল! হ্যাঁ, তাজমহলই—তবে সেটা আগ্রার নয়, বাংলার তাজমহল। সোনারগাঁও বাজারে কিছু হোটেল পাবেন, চাইলে কিছু খেয়ে নিতে পারেন। সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে গেলে দ্রুত যেতে পারেন।
কিংবা মোগরাপাড়া এসে বাসে মদনপুর এসে সেখান থেকে অটো নিয়ে যেতে পারেন। আবার ভুলতা-গাউছিয়া দিয়েও যাওয়া যায়।
নারায়ণগঞ্জের শিল্পপতি ও চলচ্চিত্রকার আহসান উল্লাহ মনি ২০০৩ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু করেন এবং ২০০৮ সালে এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বাংলার তাজমহলের নকশায় মূল তাজমহলের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এর প্রধান ভবনটি মূল্যবান স্বচ্ছ পাথরে তৈরি এবং এর ভিতরে আহসান উল্লাহ মনি ও তাঁর স্ত্রী রাজিয়ার কবর রয়েছে। তাজমহলের চার কোণে রয়েছে বড় মিনার এবং এর সামনে পানির ফোয়ারা, ফুলের বাগান, দর্শনার্থীদের বসার জায়গা।



এ ছাড়া বাংলার তাজমহলে রাজমনি ফিল্ম সিটি স্টুডিও ও রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেখানে অতিথিরা ছবি তুলতে পারেন। তাজমহলের পাশে নির্মিত হয়েছে মিসরের পিরামিডের প্রতিরূপ—সেখানেও পিরামিডের ভেতরে রাখা হয়েছে মমি-সাপের আকৃতি।মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ, ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি-ভাস্কর্য, একটি ২৫০ আসনবিশিষ্ট সিনেমা হলও রয়েছে।



সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে তাজমহল ও পিরামিড। যদি সকালেই ঘুরে ফিরে সব দেখতে পারেন আর হাতে যদি সময় থাকে তাহলে তাজমহল থেকে অটো নিয়ে ভুলতা চলে আসবেন। ভুলতা থেকে জিন্দা পার্ক কাছে—ঘুরে আসতে পারেন জিন্দা পার্ক, যদিও জিন্দা পার্ক সারাদিনব্যাপী কাটানোর মতো জায়গা।
জিন্দা পার্ক যেন এক টুকরো সবুজ স্বর্গ। ঘন গাছপালা, রঙিন ফুল, আর ছায়াময় জঙ্গলের পথ ধরে হাঁটলে মনে হয় প্রকৃতির কোলে হারিয়ে গেছি। পার্কজুড়ে ছড়িয়ে আছে শীতল ছায়া, ছোট ছোট টিলা, আর মাঝখানে শান্ত নীল জলভরা লেক। লেকের জলে সূর্যের আলো ঝিলমিল করে, মাঝে মাঝে হালকা বাতাসে জলের ঢেউ দুলে ওঠে। পাখিদের কলতান, গাছের পাতার মৃদু শব্দ—সব মিলিয়ে জিন্দা পার্ক যেন এক প্রশান্তির আশ্রয়, যেখানে মানুষ কিছু সময়ের জন্য শহরের কোলাহল ভুলে নিঃশব্দ প্রকৃতির সৌন্দর্যে ডুবে যেতে পারে। পুরো একটা দিন নিয়ে জিন্দা পার্ক ঘুরতে যাওয়া উচিত।



ঢাকা থেকে সবচেয়ে সহজ উপায় হলো কুড়িল বিশ্বরোড থেকে কাঞ্চন ব্রিজগামী বাসে উঠে ব্রিজের আগে বাইপাস মোড়ে নেমে অটো রিকশা নিয়ে সোজা জিন্দা পার্ক। কিংবা ভুলতা থেকেও একই ভাবে পার্কটিতে আসতে পারবেন।
নারায়ণগঞ্জ ছোট জেলা হলেও একদিনে ঘুরে দেখা সম্ভব নয়। পুরো আরেকটি দিন নিয়ে আপনার যাওয়া উচিত। আরও বেশ কিছু স্থাপনা রয়েছে বিভিন্ন উপজেলা জুড়ে—যেমন সোনাকান্দা দুর্গ। নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলায় শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বতীরে মুঘল আমলে নির্মিত সোনাকান্দা দুর্গ অবস্থিত। ধারণা করা হয় এই দুর্গটি ১৬৫০ সালের দিকে তৎকালীন বাংলার সুবাদার মীর জুমলা নির্মাণ করেন।
আরও রয়েছে মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি—নারায়ণগঞ্জ থেকে নরসিংদী রোডে অবস্থিত, রূপগঞ্জ থানার অন্তর্গত। ১৮৮৯ সালে ৪০ হেক্টর জমিতে জমিদার রামরতন ব্যানার্জী জমিদারবাড়ির নির্মাণকাজ শুরু করেন। বিশালায়তনের এই বাড়িতে ১০০টির বেশি কক্ষ রয়েছে। প্রায় প্রতিটি কক্ষেই পাওয়া যাবে নিখুঁত নির্মাণশৈলী আর কারুকার্যের ছোঁয়া।
কাচারি ঘর, বৈঠকখানা, অতিথিশালা, নাচঘর, পুজামণ্ডপ, ভাঁড়ারসহ বিভিন্ন অংশে ভাগ করা রয়েছে এই জমিদারবাড়ি। বর্তমানে মুড়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে জমিদারবাড়ির মূল ভবনটি।
এছাড়াও রয়েছে মোগরাপাড়া সাচিলপুর গ্রামে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের মাজার, বারদী লোকনাথ আশ্রম, হাজীগঞ্জ দুর্গ, সোনারগাঁয়ে গোয়ালদি মসজিদ, আড়াইহাজারে সাতগ্রাম জমিদারবাড়িইতিহাস-ঐতিহ্যে ভরপুর এবং অর্থনৈতিকভাবেও সমৃদ্ধ এই জেলা দেখে দ্রুতই ফিরতে পারেন ঢাকায়।
আমাদের ঢাকা ফিরতে রাত হয়ে যাচ্ছিল। পকেটে টাকা-পয়সা কম থাকাতে এক অনিশ্চিত যাত্রার সান্নিধ্যে পড়ে গেছি আমরা। এত বছর পর আজ এসে মনে হচ্ছে—এই অনিশ্চিত যাত্রার দিনগুলোই ছিল আমাদের জীবনের সেরা সময়, যা হারিয়ে গেছে। যে কোনো কিছুর বিনিময়েও আর ফেরানো সম্ভব না আহারে আমাদের সেই সময়!
জানুয়ারি ২০১৮
