সিল্কের নগরী রাজশাহী

Rafa Noman
সন্ধ্যার আকাশে গোলাপি আভা ছড়িয়ে পড়ছে। আর আমি সেই আভা দেখতে দেখতে চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহীর দিকে যাচ্ছি। বাসের জানালার বাইরে  ধীরে ধীরে অন্ধকার গ্রাস করছে চারপাশকে। আর সারা পথের পাশের  বাড়িগুলোর বাতি একে একে জ্বলে উঠেছে। চোখ বন্ধ করে মাঝে মাঝে মনে হয়। পুরো বাসে আমি শুধু একা পথযাত্রী। আর এই সন্ধ্যা আমার সঙ্গী হয়ে আছে। রাজশাহী পৌঁছানোর আগে এই একা পথে চলতে হবে।
রাতের যাত্রা সবসময় সুন্দর। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে যখন রাস্তার দুই পাশের অন্ধকার জগৎ ধীরে ধীরে গভীর হয় তখন যেন নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ পাওয়া যায়। বাসের জানালার বাইরে তাকালে দূরের টিমটিমে আলো রাস্তায় ছায়া ফেলে থাকা গাছ আর শীতল বাতাসের স্পর্শ। এগুলো যেন এক নিঃশব্দ কথোপকথনের আমন্ত্রণ জানায়।
এ সময়টায় মনে হয়, আমি আর আমার চিন্তাগুলো ছাড়া পৃথিবীতে কিছু নেই। নির্জনতার এই অদ্ভুত শক্তি—যা কোলাহল থেকে পালিয়ে পাওয়া যায়। জীবনের নানা টুকরো স্মৃতি, দুঃখ, আনন্দ, স্বপ্ন আর অপূর্ণতা নিয়ে ভেবে যেতে যেতে সময় যেন থেমে যায়। এই নির্জনতাই হয়তো আমাদের নিজেদের গভীর মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সবচেয়ে ভালো সুযোগ।
পুঠিয়া রাজবাড়ী
                                                                                                                            পুঠিয়া রাজবাড়ী
এমন নির্জনতার মাঝে যখন একাকীত্বের অনুভূতি আরও গভীর হয়ে ওঠে। মনে পড়ে নিঃসঙ্গতার কবি আবুল হাসানের কথাগুলি
“মানুষ তার চিবুকের সাথেও একা,
কেউ নেই, কিছু নেই, একা, একা, একা।”
এমন এক রাতে, যেখানে নিঃসঙ্গতা আছড়ে পড়ে। জীবনের একমাত্র সঙ্গী হতে হয় আমাদের নিজের মন এবং আত্মা সেরকম রাতে সৌন্দর্য্যে ভরপুর  রাজশাহী শহরে এসে পৌঁছালাম।
রাজশাহী বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মহানগরী। এটি উত্তরবঙ্গের দ্বিতীয় উন্নত শহর এবং প্রধান প্রশাসনিক শহর। এটি বিভাগীয় শহর হলেও অর্থনৈতিকভাবে এই বিভাগের সবচেয়ে উন্নত জেলা হল বগুড়া জেলা এবং দ্বিতীয় উন্নত জেলা হলো রাজশাহী জেলা। সাক্ষরতার হার বেশ ঈর্ষণীয় হওয়ায় একে “শিক্ষা নগরী” বলা হয়। রাজশাহী শহর পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত।
বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম বায়ু দূষণের শহর এটি। রেশমী বস্ত্রের জন্য রাজশাহীকে “রেশম নগরী” নামেও ডাকা হয়। আমের জেলাও বলা হয় রাজশাহীকে; পথে পথে বিশাল বড় বড় আমের বাগান দেখা যায়। মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে, বাগানে বাগানে পরিচর্যার কাজ শুরু হয়ে গেছে।
রাজশাহী এসে হোটেলে বিশ্রাম নিয়ে সকালে বের হলাম। শহরের বাতাসে মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসে, আর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, রাতের নিঃসঙ্গতা ভোরের আলোয় বিলীন হয়ে গেছে। গাছের ছায়া, বাড়ির জানালা, আর চায়ের গন্ধ—সব কিছু যেন নতুন দিনের আহ্বান জানায়। শহরটি ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।
ভোরবেলা রাজশাহী শহর ঘুরে দেখলাম। শহরটি যেন এক অপূর্ব শান্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সবুজ, সুন্দর এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নগরী রাজশাহী সত্যিই মনোমুগ্ধকর। শহরের প্রতিটি কোণ যেন একটি গল্প বলে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে লাগানো বিভিন্ন ধরনের লাইট শহরের সৌন্দর্যকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। বিশেষত রাতের বেলা, এই লাইটিংয়ের আলো-আধারির খেলায় বিমোহিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। রাস্তার মাঝখানে সারি সারি সবুজ গাছ লাগানো, যা দেখে মনে হয় যেন একটি শান্তিপূর্ণ গ্রামের মেঠোপথ।
আমরা রাজশাহী শহর ঘুরে নাস্তা সেরে প্রথম গন্তব্যে রওনা হলাম।
শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে পশ্চিম দিকে প্রধান সড়কের উত্তরে রিকশা বা অটোতে যাওয়া যায়। শহরের কেন্দ্রস্থল, হাতেম খান মহল্লায় অবস্থিত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর এবং বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর
                                                                                                                    বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর
১৯১০ সালে নাটোরের দিঘাপাতিয়ার জমিদার শরৎ কুমার রায়, আইনজীবী অক্ষয় কুমার মৈত্র এবং রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক রামপ্রসাদ চন্দ্র বাংলার ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের জন্য বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি গঠন করে বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে ৩২টি দুষ্প্রাপ্য নিদর্শন সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে ১৯১৩ সালে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর নিজস্ব ভবনে যাত্রা শুরু করে।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর
                                                                                                                      বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের অস্তিত্ব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানারকম সংকট দেখা দেয়। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত বরেন্দ্র জাদুঘরের অর্ধেক অংশ মেডিকেল স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৬৪ সালে পুনরায় জাদুঘর বন্ধ হবার উপক্রম হলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরটি অধিগ্রহণ করে। মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ছাড়াও বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর সংগ্রহশালা
                                                                                                          বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর সংগ্রহশালা
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সংগ্রহ সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। এখানে হাজার বছর আগের সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে। মহেনজোদারো সভ্যতা থেকে সংগৃহীত প্রত্নতত্ত্ব, পাথরের মূর্তি, ১১শ শতকের খ্রিস্টীয় বুদ্ধমূর্তি, ভৈরবের মাথা, গঙ্গা মূর্তিসহ অসংখ্য মূর্তি এই জাদুঘরের অমূল্য সংগ্রহের অন্তর্ভুক্ত। মোঘল আমলের রৌপ্যমুদ্রা, গুপ্ত সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের গোলাকার স্বর্ণমুদ্রা, সম্রাট শাহজাহানের গোলাকার রৌপ্যমুদ্রা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর সংগ্রহশালা
                                                                                                               বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর সংগ্রহশালা
এখানে প্রায় ৫ হাজার পুঁথি রয়েছে, যার মধ্যে ৩ হাজার ৬৪৬টি সংস্কৃত এবং বাকিগুলো বাংলা ভাষায় রচিত। পাল যুগ থেকে মুসলিম যুগ পর্যন্ত পরিধিতে অঙ্কিত চিত্রকর্ম, নূরজাহানের পিতা ইমাদ উদ দৌলার অঙ্কিত চিত্রও এখানে রয়েছে। জাদুঘরটিতে ১৪ হাজার গ্রন্থের সমৃদ্ধ একটি সংগ্রন্থশালাও রয়েছে। যদিও গ্রন্থাগারটি শুধুমাত্র গবেষকদের জন্য ব্যবহৃত হয়, কারণ এখানে অনেক মূল্যবান বই রয়েছে।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর সংগ্রহশালা
                                                                                                         বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর সংগ্রহশালা
জাদুঘরে প্রবেশ করতে ২০ টাকা টিকিট লাগে। বৃহষ্পতিবার এবং শুক্রবার জাদুঘরটি বন্ধ থাকে।
আমাদের পরের গন্তব্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। হাতে সময় থাকলে জাদুঘর মোড় থেকে কাছেই শতবর্ষী রাজশাহী কলেজ ঘুরে যেতে পারেন। শহর থেকে পনের মিনিটের পথ দূরে বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত।
রাজশাহী কলেজ
                                                                                                                          রাজশাহী কলেজ
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সবুজ প্রকৃতিকে উপভোগ করতে এখানে প্রতিদিন বহু স্থানীয় পর্যটক আসেন। মূলত, ক্যাম্পাসটি একটি বৃহৎ বাগানের মতো। বাগানটির ভেতরে রয়েছে বহু প্রজাতির গাছ। এর মধ্যে প্যারিস রোডের মনোমুগ্ধকর ও আকাশচুম্বী গগনশিরিশ গাছ পর্যটকদের খুব কাছে টানে। এছাড়া, আম বাগান তো আছেই।
প্যারিস রোড
                                                                                                                          প্যারিস রোড
সবুজে ঘেরা এই সুবিশাল ক্যাম্পাসে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে  আড্ডা দিতে সারাদিন লেগে যেতে পারে। তাছাড়া, অটোরিকশায় করেও বেড়ানো যায়। দিন, সন্ধ্যা বা রাত, যখনই হোক না কেন, ক্যাম্পাসে অটোরিকশা পাওয়া যায়।
ক্যাম্পাসের জনপ্রিয় স্থান যেমন—টুকিটাকি চত্বর, পরিবহন চত্বর, ক্যাফে গ্রিনভিউ, কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়া ও চারুকলা চত্বরে খাবারের দোকান রয়েছে। এসব দোকানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খাবার পাওয়া যায়। সিলসিলা রেস্তোরাঁয় গাছের ছায়া, পাখির ডাক ও রেস্তোরাঁর সঙ্গে লাগোয়া পুকুর যে কাউকে আকৃষ্ট করে, সেখানে লম্বা সময় ধরে বসে থাকার জন্য প্রস্তুত।
রাজশাহী জেলা আসলে একদিনে ঘুরে দেখা সম্ভব নয়। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে শহরে ফিরে আবার হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে সূর্যাস্ত দেখতে পদ্মার তীরে চলেছি।
পদ্মার চার ও বাঁধ
রাজশাহী শহর মূলত পদ্মা নদীর পাশে অবস্থিত। আর পদ্মা নদীর পাশ দিয়ে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ধরনের বিনোদন কেন্দ্র, যার মধ্যে পদ্মা গার্ডেন একটি উন্মুক্ত বিনোদন কেন্দ্র।
পদ্মা
                                                                                                                                         পদ্মা
কাছেই লালন শাহ মুক্তমঞ্চ হলো পদ্মার তীর বেয়ে ঘেঁষে ওঠা  উন্মুক্ত বিনোদন কেন্দ্র, এখানে রয়েছে মুক্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সুবিধা।
এই রোড ধরেই  দুটি বাঁধ আছে, একটি টি বাঁধ আরেকটি আই বাঁধ। বর্ষায় পানির রূপে অপরূপ হয়ে ওঠে এই বাঁধগুলো, আবার শুকনোতে ধু ধু মরুভূমির মতো চর থেকে চর দেখা যায়। প্রতিদিন বিকেলে অসংখ্য মানুষ ভিড় জমায় এই বাঁধ এবং বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে।
রাতের রাজশাহী শহর দেখার লোভ ছিল অনেক দিনের আজ রাতে শহরে চক্কর দিতে বের হয়েছি। রাতের রাজশাহী শহর জুইতের। রাজশাহীর প্রতিটি রাস্তা দেখলেই আপনার মন জুড়ায় যাবে। আরও বেশি বিমোহিত হতে থাকবেন রাতের আলোকসজ্জিত রাস্তাগুলো দেখলে।  তালাইমারি থেকে আলুপট্টি, তেরোখাদিয়া, এছাড়া প্লেন চত্বরের রাস্তা। রাতে এই রাস্তাগুলোতে রিকশায় জুইতের সময় কেটে যাবে।
রাতের রাজশাহী শহর
                                                                                               রাতের রাজশাহী শহর( ছবি ফেইসবুক থেকে নেয়া)
রাতে থাকার জন্য আলুপট্টি, শহীদ কামরুজ্জামান চত্বরে, রেলগেট, স্টেশন রোড, সাহেব বাজারে বেশ কিছু হোটেল পাবেন, দেখে শুনে উঠতে পারেন। আমরা রাতে আবরো কলাই রুটি আর ভর্তা খেয়ে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছি, পরদিন লম্বা যাত্রা।
রাজশাহী শহর শিরইল বাস স্ট্যান্ড থেকে বাস যায় বাঘা সদর উপজেলায়। বাঘা বাজার থেকে কাছেই মসজিদ। বিশাল দিঘীর পাশে বাঘা মসজিদ।
বাঘা মসজিদ
                                                                                                                                বাঘা মসজিদ
একদা রাজশাহী অঞ্চলের এই এলাকা ছিল গভীর বনজঙ্গলে ঘেরা। এলাকায় তখনো জনবসতি তেমন একটা গড়ে ওঠেনি। এমন এক সময়ে বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদের বংশধর হজরত মাওলানা শাহ আব্বাসের পুত্র হজরত মাওলানা শাহ মুয়াজ্জিমুদ্দৌলা ধর্মপ্রচারে এসে এই এলাকায় আস্তানা স্থাপন করেন। মাওলানা শাহ মুয়াজ্জিমুদ্দৌলা এই জনপদে পরিচিত হয়ে ওঠেন হজরত শাহ দৌলা (রহ.) নামে। ইসলামের প্রচারই ছিল তাঁর কার্যক্রমের প্রধান লক্ষ্য।
বাঘা মসজিদ
                                                                                                                                    বাঘা মসজিদ
হজরত শাহ দৌলা (রহ.) সে সময় একটি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীকালে ১৫২৩ থেকে ১৫২৪ সালে হুশেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র সুলতান নসরত শাহ এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। বিশাল একটি দিঘি কেটে পাশেই এর মাটি দিয়ে জায়গাটি উঁচু করে সেখানেই নির্মাণ করা হয় মসজিদটি। সমতল ভূমি থেকে মসজিদটি ৮-১০ ফুট উঁচু আঙ্গিনার ওপর অবস্থিত।
বাঘা মসজিদ
                                                                                                                            বাঘা মসজিদ
১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে বাঘা শাহী মসজিদের ক্ষতি হয়। ভেঙে পড়ে ওপরের ১০টি গম্বুজ। এরপর থেকে দীর্ঘদিন মসজিদের ভেতরটা পরিত্যক্ত ছিল। পরে গম্বুজগুলো পুনর্নিমাণ করা হয় ১৯৭৬ সালে। শাহী মসজিদের সামনেই ৫২ বিঘা জমির ওপর বিশাল দিঘি এবং সেই দিঘির ধারে থাকা সারি সারি নারিকেল গাছ এলাকাটির সৌন্দর্য অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদ ঘিরে রয়েছে ওলী আউলিয়াদের মাজার, দরগা ও জাদুঘর। মসজিদের উত্তর পাশে রয়েছে হজরত শাহ দৌলা (রহ.) এবং তাঁর পাঁচজন সঙ্গীর মাজার। মাজারের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রয়েছে হজরত শাহ (রহ.)-এর পরিবারের সদস্যদের মাজার। মসজিদ প্রাঙ্গণের বাইরে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রয়েছে দুজন বাগদাদি দরবেশের মাজার। প্রতি বছর মেলা হয় এখানে মেলাটি প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যের একটি অন্যতম নিদর্শন।
বাঘা থেকে আমাদের পরের যাত্রা পুটিয়া উপজেলা। আমরা মূল রাস্তা বাদ দিয়ে গ্রামের ভেতর দিয়ে পুটিয়া যাচ্ছি, রংপুর-রাজশাহী দিকে গ্রামগুলো আমাকে টানে বই  পত্র কিংবা কবিতায় যেরকম গ্রামের বর্ণনা ঠিক সেরকম সব গ্রাম এই উত্তরে। শীত প্রায় শেষ, তবু এই অঞ্চলে ভোরের দিকে কুয়াশা তুষারের মতো দেখা যায়। পুটিয়ার কাছাকাছি গ্রামগুলো বেশ পুরোনো বসতি।
পুঠিয়া রাজবাড়ী আমাদের রাজশাহী জেলার শেষ গন্তব্য। এটি বেশ রমরমা এবং বাংলাদেশের যে কয়েকটি রাজবাড়ী এখনো স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যে পুঠিয়া রাজবাড়ী অন্যতম।
পুঠিয়া রাজবাড়ী
                                                                                                                      পুঠিয়া রাজবাড়ী
পুঠিয়া রাজবংশ মুঘল সম্রাট আকবরের সময় (১৫৫৬-১৬০৫) প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় পুঠিয়া লস্করপুর পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৫৭৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবরের সুবেদার মানসিংহ বাংলা দখল করার সময় পুঠিয়া এলাকার আফগান জায়গীরদার লস্কর খানের সাথে যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে পুঠিয়া রাজবংশের প্রথম পুরুষ বৎসাচার্য, যিনি পুঠিয়ায় একটি আশ্রম পরিচালনা করতেন, মানসিংহকে বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন, ফলে লস্কর খান পরাজিত হন। এই কারণে মানসিংহ বৎসাচার্যকে পুঠিয়া এলাকার জমিদারি দান করেন।
পুঠিয়া রাজবাড়ী
                                                                                                                              পুঠিয়া রাজবাড়ী
বৎসাচার্য জমিদারি নিজ নামে না নিয়ে তার পুত্র পীতম্বরের নামে বন্দোবস্ত নেন। পীতম্বর জমিদারীর আয়তন বৃদ্ধি করেন। পীতম্বর নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তার সহোদর নীলাম্বর জমিদারী লাভ করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর তাকে রাজা উপাধি দেন। নীলাম্বরের মৃত্যুর পর তার পুত্র আনন্দরাম সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। আনন্দরামের একমাত্র পুত্র রতিকান্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র রামচন্দ্র সমস্ত সম্পত্তির মালিক হন। রামচন্দ্রের দ্বিতীয় পুত্র নরনারায়নের পর তার একমাত্র পুত্র প্রেমনারায়ন রাজ্যাধিকার লাভ করেন। প্রেমনারায়নের পুত্র অনুপনারায়ন এর সময়ে পুঠিয়া জমিদারী বার্ষিক ১,২৫,৫১৬ টাকা খাজনায় মুর্শিদকুলী খানের সাথে বন্দোবস্ত হয়। অনুপনারায়নের চার পুত্র (নরেন্দ্র, মেদ নারায়ন, রুপ নারায়ণ ও প্রাণ নারায়ণ) এর মধ্যে ১৭৪৪ সালে রাজ্যটি বিভক্ত হয়।
তিন আনা জমিদার বাড়ী
                                                                                                          তিন আনা জমিদার বাড়ীর অংশ
বড় ভাই নরেন্দ্র নারায়ণের অংশে পাঁচ আনা এবং ছোট তিন ভাইয়ের অংশে সাড়ে তিন আনা নির্ধারিত হয়। বড় ভাই নরেন্দ্র নারায়ণের অংশ পাঁচ আনি এস্টেট এবং রুপ নারায়ণের অংশ চার আনি এস্টেট নামে পরিচিত। নরেন্দ্র নারায়ণের জ্যেষ্ঠ পুত্র ভুবেন্দ্রনাথ ১৮০৯ সালে রাজা বাহাদুর উপাধি লাভ করেন। ভুবেন্দ্রনারায়ণের একমাত্র পুত্র জগন্নারায়ণ রায়ের দ্বিতীয় স্ত্রী ভুবনময়ী হরেন্দ্রনারায়ণকে দত্তক নেন। রাজা হরেন্দ্রনারায়ণের পুত্র যোগেন্দ্রনারায়ণ মৃত্যুর পূর্বে সকল সম্পত্তি স্ত্রী শরৎসুন্দরীর নামে দিয়ে যান। শরৎসুন্দরী ১৮৬৬ সালে রাজশাহীর গুনাইপাড়ার কেশবকান্ত চক্রবতীর পুত্র রজনীকান্তকে দত্তক নিয়ে নাম দেন যতীন্দ্রনারায়ণ।
মন্দিরের দেয়ালে টেরাকোটা
                                                                                                              মন্দিরের দেয়ালে টেরাকোটা
শরৎসুন্দরী শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে প্রচুর দান করতেন। তার অজস্র দান ও নিঃস্বার্থ জনসেবায় মুগ্ধ হয়ে ১৮৭৪ সালে বৃটিশ সরকার তাকে “রানী” উপাধিতে এবং পরবর্তীতে ১৮৭৭ সালে “মহারানী” উপাধিতে ভূষিত করেন। কুমার যতীন্দ্রনারায়ণ ১৮৮০ সালে ঢাকা জেলার ভূবনমোহন রায়ের কন্যা হোমন্তকুমারী দেবীকে বিয়ে করেন। হোমন্তকুমারী দেবী ১৫ বছর বয়সে ৬ মাসের সন্তান গর্ভে নিয়ে বিধবা হন। তিনি পুঠিয়ার বিরাট রাজ প্রাসাদটি নির্মাণ করে শাশুড়ী মহারানী শরৎসুন্দরী দেবীর শ্রদ্ধায় উৎসর্গ করেন। হেমন্তকুমারী দেবী বহুসংখ্যক সৎকাজের জন্য লর্ড কার্জন কর্তৃক ১৯০১ সালে “রানী” এবং ১৯২০ সালে লর্ড আরউইনের আমলে “মহারানী” উপাধিতে ভূষিত হন। তার মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে সারাদেশে জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে গণজাগরণ ঘটলে ক্রমান্বয়ে পুঠিয়া রাজবংশেরও বিলোপ ঘটে।
মন্দিরের দেয়ালে টেরাকোটা
                                                                                                                মন্দিরের দেয়ালে টেরাকোটা
পুঠিয়ায় কয়েকটি  রাজবাড়ী ও ১৩টি মন্দির রয়েছে। পুঠিয়ার প্রত্ননিদর্শনের মধ্যে ১৪টি স্থাপনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে।
পাঁচআনি জমিদারবাড়ি বা পুঠিয়া রাজবাড়ী
পাঁচআনি জমিদারবাড়ি বা পুঠিয়া রাজবাড়ী
১৮৯৫ সালে মহারানী হেমন্তকুমারী দেবী আকর্ষণীয় ইন্দো ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতিতে আয়তাকার, দুইতলা বর্তমান রাজবাড়ীটি নির্মাণ করেন। ভবনের সম্মুখ ভাগের স্তম্ভ, অলংকরণ, কাঠের কাজ, কক্ষের দেয়ালে ও দরজার উপর ফুল ও লতাপাতার চিত্রকর্ম চমৎকার নির্মাণ শৈলীর পরিচয় বহন করে। রাজবাড়ীর ছাদ সমতল, ছাদে লোহার বীম, কাঠের বর্গা এবং টালি ব্যবহৃত হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য রাজবাড়ির চারপাশে পরিখা খনন করা হয়েছিল।
পাঁচ আনি জমিদার বাড়ী
                                                                                                                    পাঁচ আনি জমিদার বাড়ী
গোবিন্দ মন্দির পুঠিয়া পাঁচআনি জমিদারবাড়ির অঙ্গনে অবস্থিত গোবিন্দ মন্দির একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি। প্রেম নারায়ণ রায় আঠারো শতকের প্রথম দিকে এই মন্দির নির্মাণ করেন বলে জানা যায়।
গোবিন্দ মন্দির
                                                                                                                            গোবিন্দ মন্দির
ছোট আহ্নিক মন্দির পুঠিয়া রাজবাড়ীর দক্ষিণ পাশে এ মন্দির অবস্থিত।
ছোট আহ্নিক মন্দির
                                                                                                                    ছোট আহ্নিক মন্দির
ছোট শিব মন্দির
বর্গাকারে নির্মিত ছোট আকৃতির এ মন্দিরটি রাজবাড়ীর দক্ষিণে পুঠিয়া-আড়ানী সড়কের পূর্বপাশে অবস্থিত। পোড়ামাটির অলংকরণ দ্বারা সজ্জিত।
ছোট শিব মন্দির
                                                                                                                          ছোট শিব মন্দির
দোল মন্দির
পুঠিয়া বাজারের মধ্যে অবস্থিত বর্গাকারে নির্মিত ৪ তলা বিশিষ্ট একটি সুদৃশ্য মন্দির। পুঠিয়ার পাঁচআনি জমিদার ভুবেন্দ্রনারায়ণ রায় ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
ছোট শিব মন্দির
                                                                                                                               ছোট শিব মন্দির
বড় শিব মন্দির
পুঠিয়া বাজারে প্রবেশ করতেই হাতের বাম পাশে শিবসাগর নামক দীঘির দক্ষিণ পাড়ে বড় শিব মন্দির অবস্থিত। ১৮২৩ সালে নারী ভূবনময়ী দেবী এ মন্দিরটি নির্মাণ করেন। উচ্চ মঞ্চের উপর নির্মিত মন্দিরটির দক্ষিণ দিকে সুপ্রশস্ত সিঁড়িসহ প্রধান প্রবেশপথ। মন্দিরের উত্তর পাশে অবস্থিত দীঘিতে নামার জন্য বাঁধানো ঘাট রয়েছে।
বড় শিব মন্দির
                                                                                                                            বড় শিব মন্দির
জগন্নাথ/রথ মন্দির
শিবসাগর দীঘির দক্ষিণ পাশে জগন্নাথ বা রথ মন্দির অবস্থিত। মন্দিরটি ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে রানী ভূবনময়ী কর্তৃক নির্মিত বলে জানা যায়।
জগন্নাথ/রথ মন্দির
                                                                                                                                 রথ মন্দির
চারআনি জমিদার বাড়ী ও মন্দিরসমূহ
পাঁচআনি রাজবাড়ী থেকে প্রায় ১২৫ মিটার পশ্চিমে শ্যামসাগর দিঘীর পশ্চিম পাড়ে পুঠিয়ার চারআনি জমিদারবাড়ী অবস্থিত। চারআনি জমিদার কর্তৃক বড় আহ্নিক, ছোট গোবিন্দ ও গোপাল মন্দির নামে পরিচিত তিনটি মন্দির একই অঙ্গনে পাশাপাশি রয়েছে।
চার আনি জমিদার বাড়ী
                                                                                                                     চার আনি জমিদার বাড়ী
হাওয়া খানা
পুঠিয়া-রাজশাহী মহাসড়কের তারাপুর বাজার থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দক্ষিণে এবং পুঠিয়া বাজার থেকে ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে একটি পুকুরের মধ্যবর্তী স্থানে হাওয়াখানা অবস্থিত। এটি দুইতলা একটি ইমারত, যার নিচতলা আর্চযুক্ত। পুঠিয়া রাজবাড়ীর সদস্যরা রাজবাড়ী থেকে রথ বা হাতীযোগে পুকুরে নৌকায় চড়ে এসে অবকাশ যাপন এবং পুকুরের খোলা হাওয়া উপভোগ করতেন।
হাওয়া খানা
                                                                                                                                   হাওয়া খানা
পুঠিয়া রাজবাড়ী নাঠোর-রাজশাহী মহাসড়কের কাছেই অবস্থিত, তাই রাজশাহী কিংবা নাঠোর থেকে আসতে পারবেন। বাসে পুঠিয়া এসে হেঁটে বা ভ্যানে রাজবাড়ী পৌঁছাতে পারেন। দুপুরে পদ্মার মাছ দিয়ে পুঠিয়া বাজারে খেয়ে আপনার গন্তব্যে চলে যেতে পারেন। আমরা পুঠিয়া নাঠোর যাচ্ছি এবং রাতে সেখানেই থাকবো।
হাওয়া খানা
                                                                                              পুঠিয়া থেকে বাস যায়, মোটামুটি ৩০-৪০ মিনিটের পথ।
ধ্বংসাবশেষ
                                                                                                                             ধ্বংসাবশেষ
বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। পুঠিয়া রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখে মনে হলো। একসময় যেটি ছিল রাজ্যভেদের শক্তির কেন্দ্র। আজ তা সময়ের হাতে হারিয়ে গেছে। রাজবাড়ির বিশাল দরজা সুউচ্চ মিনার যেগুলো একসময় রাজাদের অট্টালিকার মতো গর্বের প্রতীক ছিল আজ শীথিল ও বিবর্ণ হয়ে গেছে।
পুটিয়া রাজবাড়ী
                                                                                                         চার আনী জমিদার বাড়ী ধ্বংসাবশেষ
যতটা দুর্দান্ত ছিল রাজবাড়ির বাহ্যিক গঠন ততটাই নীরব আজ তার ভিতরের ইতিহাস। রাজারা যারা একসময় এই স্থান থেকে শাসন করতেন। তাদের স্মৃতি যেন এখন শুধুই ধোঁয়ার মতো বিলীন হয়ে গেছে বাতাসে। রাজবাড়ির দেওয়ালে দাগ পড়েছে। প্রাচীন মেঝে উঠে গেছে।আর এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে অবহেলা ও দুঃসময়ের চিহ্ন।
যতটুকু শক্তি একসময় ছিল। আজ তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। তবে, এই বিলুপ্তির মাঝে  একটা গল্প লুকিয়ে আছে একসময়কার ঐশ্বর্য এখন শুধুই অতীতের সুর যা বাতাসে মিশে গিয়েছে।
এ যেন আমাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি। জীবনের এক একটি মুহূর্তে আমরা যেভাবে আমাদের শক্তি ও গৌরব দেখাই, ঠিক তেমনি সময়ের সাথে তা অদৃশ্য হয়ে যায়।
বিঃদ্রঃ ঘুরতে গিয়ে কোথাও ময়লা ফেলবেন না এবং স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করুন।
ফেব্রুয়ারি ২০১৯
{{ reviewsTotal }}{{ options.labels.singularReviewCountLabel }}
{{ reviewsTotal }}{{ options.labels.pluralReviewCountLabel }}
{{ options.labels.newReviewButton }}
{{ userData.canReview.message }}

Hi, I'm Rafa

Welcome to my world of exploration! I’m a passionate travel blogger from Bangladesh, dedicated to showcasing the incredible beauty and rich culture of my homeland.

Find us on Facebook