যমুনা পাড়ের সিরাজগঞ্জ
আমার কিছু অদ্ভুত বন্ধু আছে। অদ্ভুত বলতে তাদের প্রফেশনের কথা বলছি। পৃথিবীতে এত-সব প্রফেশন থাকতে আমার এক বন্ধু বেলুন বিক্রি করে। বেলন বিক্রি করা খারাপ না। তার যোগ্যতা আছে ৮-৯টা এসি রুমে বসে আরো বেশি টাকা আয় করার কিন্তু সে বেলুন ফেরী করে । প্রতিদিন বিকেলে বের হয় সন্ধ্যা পর্যন্ত হরেক-রকমের বেলুন বিক্রি করে। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম কেন এতো সব প্রফেশন থাকা সত্ত্বেও এই প্রফেশনে ডুকলি। সে মুখটা বাঁকিয়ে পৈশাচিক আনন্দ পাবার ভঙ্গিতে বললো “হাসি বিক্রি করি বন্ধু হাসি” আমি তথমতো খেয়ে ছিলাম তার কথায়। সে বাচ্চাদের কাছে এক চিলতে হাসি বিক্রি করে! বাচ্চারা যখন হাতে বেলুন নিয়ে চোখ মুখ ভর্তি করে হাসি দেয় সেটা দেখার জন্যই নাকি তার এই প্রফেশন।
আরো এক অদ্ভুত কাজ করে সে আনন্দ পায়। তার বেশিরভাগ বেলুন হলুদ। কারনটাও অদ্ভুত ভিনসেন্ট ভ্যানগগ হলুদ কে বেদনার রং বলেছেন সে আবার ভ্যানগগ এর খুব ভক্ত। তাই সে হলুদ বেলুন দিয়ে হাসি বিক্রি করে বেদনার রং কে হাসির রং এ পরিণত করে সে নিজেও আনন্দ পায়। অটল সম্পত্তি ছেড়ে সেই এই সুখ খুঁজে নিয়েছে। দুনিয়ায় সব অদ্ভুত মানুষের সাথে আমার পরিচিত!
এমনি এক অদ্ভুত মানুষের সাথে ঘুরতে বের হয়েছি। যে মানুষের উপকার করার জন্য নিজের জিনিস পত্র বিক্রি করে দেয়! মানুষের উপকার করতে যেয়ে বেশ কয়েকবার তার ফোন বিক্রি করে দিয়েছে। আমরা ঢাকা থেকে কোথায় যাবো গন্তব্য না ঠিক করে গাবতলী থেকে বগুড়া গামী বাসে উঠেছি। যেখানে মন চাইবে সেখানে নেমে যাবো।
মানুষ বিরক্ত আমরা নাকি অনেক ক্ষন ধরেই আটকে আছি। দুইজনে দুইটা পপর্কন নিয়েছি।বিচিত্র ভঙ্গিমায় খেতে খেতে বেশ আনন্দ লাগছিল এই জ্যামে আমাদের কোন বিরক্ত নেই। কারন আমাদের কোন তাড়া নেই। আমরা এতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না! আমাদের মন যেখানে যেতে চায় সেখানে পৌছানোর জন্য কোন তাড়া নেই।
মধ্য রাতে যমুনা সেতু’তে পৌঁছে আর বাসে চড়তে ভালো লাগছিল না। তাই সেতু পার হয়ে সিরাজগঞ্জ রোড চৌরাস্তায় নেমে অপেক্ষা করছি ভোর হবার! এরকম বড় হাইওয়ের পাশে ভোর জুইতের না একটু পর পর বাস ট্রাকের কর্কশ হর্ন কানে তালা লাগার মত। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে দ্রুত এই জায়গা থেকে সরে যেতে হবে।
অন্ধকার বড্ড রহস্যময়! অন্ধকারে থাকলে কত কিসিমের মানুষ দেখা যায়! একটা ছোট চায়ের দোকানে বসে আছি একটু পর-পর একজন দুইজন আসে আমাদের দিকে তাকায় কোথায় যাবো জানতে চেয়ে চলে যায়। দুনিয়া বড়ই রহস্যময়। অপেক্ষা করতে করতে সিদ্ধান্ত হলে ঢাকায় চলে যাবো আজ সারাদিন সিরাজগঞ্জ ঘুরে।
সিরাজগঞ্জ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের প্রবেশধার। যমুনা নদী পার হলেই সিরাজগঞ্জ। বেশ উন্নত শহর ধারনা করা হয় বেলকুচি থানার সিরাজ উদ্দিন চৌধুরি নামে জমিদার ছিলেন। তিনি তার এলাকায় একটি গঞ্জ স্থাপন করেন সে গঞ্জ অনুসারে সিরাজগঞ্জ নামকরন হয়।
আমরা যে রোডে চৌরাস্তায় আছি এই জায়গা থেকে সি এন জি যায় পাশের উপজেলা শাহজাদপুরে। আমাদের প্রথম গন্তব্য শাহাজাদপুর রবীন্দ্র কাচারিবড়িতে। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শাহজাদপুরের কাচারিবাড়ী। এটি রবীন্দ্রনাথের পৈতৃক জমিদারি তত্ত্বাবধানের কাচারি ছিল। তারও পূর্বে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এটি নীলকরদের নীলকুঠি ছিল। সে কারনে এখনও অনেকে একে কুঠিবাড়ী বলে। পরে রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এটি নিলামে কিনে নেন। এখানে রয়েছে জমিদারদের খাজনা আদায়ের কাচারির একটি ধ্বংসাবশেষ। একটি বেশ বড় দ্বিতল ভবন। বর্তমানে এখানে নির্মিত হয়েছে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম। দ্বিতল ভবনটি বর্তমানে রবীন্দ্র জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আঙ্গিনার বিস্তৃত জায়গা জুড়ে তৈরী করা হয়েছে সুদৃশ্য ফুলবাগান।
রবীন্দ্রনাথের পিতার আদেশে ঊনত্রিশ বছর বয়সে ১৮৯০ সালে জমিদারি তত্ত্বাবধানের জন্য প্রথম শাহজদাপুর আসেন। রবীন্দ্রনাথ এখানকার প্রকৃতি ও মানুষের বিচিত্র জীবন প্রবাহের সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হন।
রবীন্দ্রনাথ ১৮৯০ থেকে ১৮৯৬ মোট ৭ বছর জমিদারির কাজে শাহজাদপুরে আসা-যাওয়া এবং অবস্থান করেছেন।তার এই শাহজাদপুরে আসা-যাওয়া শুধু জমিদারি তত্ত্বাবধানের বস্তুনিষ্ঠ প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
জমিদারির প্রয়োজনকে ছাপিয়ে প্রাধান্য পেয়েছে কবির সাহিত্য সৃষ্টির অনুপ্রেরণা ও সৃজনশীলতা। এই সময়ের মধ্যে এখানে তিনি তাঁর অনেক অসাধারণ কালজয়ী সাহিত্য রচনা করেছেন। এর মধ্যে ‘সোনার তরী’ ‘বিসর্জন’ নাটকও এখানে রচিত।
ঠাকুর পরিবারে জমিদারি ভাগাভাগির ফলে শাহজাদপুরের জমিদারি চলে যায় রবীন্দ্রনাথের অন্য শরীকদের হাতে। তাই ১৮৯৬ সালে তিনি শেষ বারের মতো শাহজাদপুর থেকে চলে যান। এর পরে তিনি আর শাহজাদপুরে আসেননি। শাহজাদপুর ছিল রবীন্দ্রনাথের অত্যান্ত প্রিয় এবং ভালোবাসার একটি স্থান।
শাহাজাদপুর থেকে পাবনা কাছে। পাবনার দিকের পদ্মা পার হলেই কুষ্টিয়া রবীন্দ্রনাথের কুটিবাড়ি। পদ্মার দুই পাড়ে চলতো ঠাকুরবাড়ির জমিদারি। বিশ টাকা টিকিট কেটে রবিবার ব্যাতিত সপ্তাহের প্রতিদিন ১০টা থেকে ৫’টায় যাওয়া যেত কাচারিবাড়ি।
কাচারি বাড়ির থেকে কাছেই হযরত মখদুম শাহদৌলার মাজার কথিত আছে। ইয়েমেনের শাহজাদা মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী ১১৯২-৯৬ সালের মধ্যে ইয়েমেন থেকে ধর্ম প্রচারার্থে যাত্রা শুরু করে বোখারা শহরে আগমন করেন। বোখারা শহরে জালালুদ্দিন বোখারী এর দরবার শরীফে কিছু সময় অতিবাহিত করে তিনি বাংলার পথে যাত্রা শুরু করে বাংলার শাহজাদপুর অঞ্চলে আসেন।
মানচিত্রের দিকে তাকালে কত ছোট মনে হয় আমাদের বাংলাদেশ অথচ কত ইতিহাস কত-শত মানুষের আগমন ঘটেছে এই ছোট্ট দেশে।

শাহজাদপুর থেকে আবার সিরাজগঞ্জ রোড ফিরে আমাদের পরের যাত্রা উল্লাপারা উপজেলার হাটকুমিরুল গ্রামে। রোড থেকে কাছেই ভ্যানে যাওয়া যায় চৌরাস্তা কিংবা হাটিকুমিরুল বাজার হয়ে নবরন্ত মন্দির। আমরা হাটিকুমরুল বাজার থেকে হেঁটে যাচ্ছি। হাটিকুমরুলের বাজার থেকে দুইপাশের ধান ক্ষেতের বুক চিড়ে সেখান থেকে ছোট্ট একটি মেঠো পথ আঁকাবাঁকা এই পথের ধারেই এই মন্দির যোতে হয়।

ছায়া ঘেরা এই মন্দির সিরাজগঞ্জে কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুলের এই নবরত্ন মন্দির। আনুমানিক ১৭০৪-১৭২৮ সালের মধ্যে নবাব মুর্শিদকুলি খানের শাসনামলে রামনাথ নামক জমিদার মতান্তরে তশিলদার এই মন্দির নির্মাণ করেন।

বাংলাদেশে প্রাচীন যেসব হিন্দু মন্দির দেখতে পাওয়া যায় সেগুলোর অন্যতম একটি এই হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির। তিনতলা বিশিষ্ট এই স্থাপনার ওপরের রত্ন বা চূড়াগুলো প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরো মন্দিরের বাইরের দিক পোড়া মাটির অলঙ্করণে ঢাকা। এসব অলঙ্করণে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানান দেবদেবীর মূর্তি, লতা-পাতা ইত্যাদি দিয়ে।

রামনাথ ভাদুরী দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরের মতই এখানে মন্দির তৈরি করেন। হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দিরের আশপাশে আরও তিনটি ছোট মন্দির রয়েছে। নবরত্ন মন্দিরের উত্তর পাশে আছে শিব-পার্বতী মন্দির। পাশে দোচালা আকৃতির চন্ডি মন্দির এবং দক্ষিণ পাশের পুকুরের পশ্চিম পাড়ে আছে শিব মন্দির।

হাটিকুমরুল বাজার থেকে বাস, সি এন জি সিরাজগঞ্জ শহরে আসে। সিরাজগঞ্জ শহরে ফিরে শহর ঘুরে দুপুরে খেয়ে বিকেলটা কাটাতে যেতে পারেন যমুনার তীরে চায়না বাঁধে। তার আগে শহরে’ই পানতোয়া খেতে পারেন এটা সিরাজগঞ্জের বিখ্যাত মিষ্টি। যদিও পানতোয়ার আদি স্বাধ পেতে হলে এনায়েতপুর থানার বাঁশতলা বাজারে যেতে হবে। পানতোয়া ইতিহাস প্রায় ১০০ বছর আগের এই অঞ্চলের বেশ জনপ্রিয় খাবার এটি।

সিরাজগঞ্জ সদর যে কোন জায়গা থেকে ভ্যান বা অটো রিক্সায় করে চায়না বাঁধে যেতে পারেন।
বর্ষায় সমুদ্র সাদৃশ্য যমুনা,আর শরৎ কাঁশফুলে আপনাকে মুগ্ধ করবে। পাশে উইন্ডমিলের বড় বড় পার্ক । এই পার্ক গুলো আপনার বিকেলটা কে আরও সুন্দর করে তুলবে। বাঁধা থেকে সরাসরি ঢাকা স্ট্যন্ড ফিরে ঢাকার বাস ধরে ৩ ঘন্টায় ফিরতে পারেন ঢাকা । চাইলে খুব ভোরে রওনা দিয়ে একদিনে ঘুরে আসতে পারবেন সিরাজগঞ্জ।

ঝড় বৃষ্টির মৌসুম চলছে এখন। যমুনা প্রায় সমুদ্র সাদৃশ্য। বাঁধে প্রচুর মানুষ থাকায় বেশি সময় থাকতে ইচ্ছে করেনি। ইদানিং নতুন রোগ হয়েছে বেশি মানুষ ভালো লাগে না। অবশ্য মানুষের কি দোষ, দিন দিন চিত্ত বিনোদনের জায়গা যেভাবে কমছে। একটু জায়গা পেলেই মানুষ স্বস্তি পাওয়ার জন্য সেখানে ভীর করে। আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে একদিন দেখা যাবে আর কোন খোলা যায়গা নেই। শুধু কৃত্রিম জঙ্গল । ছোট পাখিদেরও সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে গাছগুলো সরে যাচ্ছে!

সন্ধ্যায় ঢাকায় ফেরার বাস ধরেছি। যমুনা সেতুর উপর দিয়ে বাস তার আপন গতিতে চলছে। বাসে বসে নিচে পানির স্রোতের দিকে থাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছে যদিও এই তাকিয়ে থাকা ক্ষনস্থয়ী। আমরাই যেখানে ক্ষনস্থয়ী। এই অল্প সময়ের জন্য এতো আয়োজন করে কি হবে! আমারো মাঝে মধ্যে ইচ্ছে জাগে আমার অদ্ভুত বন্ধুর মত আমিও যদি হাসি বিক্রি করতে পারতাম! অবশ্য মানুষের সব ইচ্ছে পূরণ হয়ে গেলে বেঁচে থাকার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়!
বিঃদ্রঃ ঘুরতে গিয়ে কোথাও ময়লা ফেলবেন না এবং স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করুন।
এপ্রিল ২০২২



