নেত্রকোনাতে হাওরের দিনরাত্রি

Rafa Noman

আমাদের প্রায় সবারই জীবনে কখনো না কখনো এমন মুহূর্ত আসে, যখন সব কিছু ছেড়ে-ছুড়ে দু’চোখ যেদিকে যায় সেদিকেই চলে যেতে ইচ্ছে করে। বিশেষ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে—এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। আমিও সেই দলে একবার নাম লিখিয়েছিলাম। খুব পরিকল্পনা করে, রাগের নাটক সাজিয়ে, বন্ধু মোস্তফার সঙ্গে সেবার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম।

 

গফরগাঁও থেকে ট্রেনে চেপে রওনা দিলাম নেত্রকোনার উদ্দেশে। চূড়ান্ত গন্তব্য দুর্গাপুর—মোস্তফার এক আত্মীয়ের বাড়ি। শীত তখন প্রায় শেষের পথে, যে কোনো মুহূর্তে দক্ষিণ পশ্চিমের শুকনো গরম হাওয়া এসে পড়তে পারে। কিন্তু শেষ রাতজুড়ে কুয়াশা তখনও রাজত্ব করছে—চারদিক ঝাপসা, দৃশ্যগুলো যেন ইচ্ছে করেই নিজেকে আড়াল করে রাখছে।

 

মাঝরাতে নেত্রকোনা স্টেশনে পৌঁছে ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষা। জানা গেল, খুব ভোরে একটা লোকাল ট্রেন যায় জারিয়া–জানঞ্জাইল। সেটাই ধরব। ভোরের সেই লোকাল ট্রেনেই জীবনের প্রথম এক দুঃসাহসিক কাজ করে বসলাম—ট্রেনের ছাদে ওঠা। ভয় আর কুয়াশা যেন একসঙ্গে আক্রমণ করল। নিচে অন্ধকার রেললাইন, চারপাশে সাদা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা, আর মাথার ওপর অসীম আকাশ। আল্লাহ খোদার নাম মুখে নিয়ে কোনোমতে ছাদ আঁকড়ে বসে আছি।

 

মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছি—“এবার যদি বেঁচে ফিরি, আর কখনো ট্রেনের ছাদে উঠব না।” জানি, এই প্রতিজ্ঞা রাখা হবে না; তবু ভয় মানুষকে সাময়িক সত্যবাদী করে তোলে। কোনো রকমে জারিয়ায় পৌঁছে যখন নামলাম, মনে হলো নতুন করে নিঃশ্বাস পেলাম। জীবন যেন আবার ফিরে এলো।

ট্রেনের ছাদে জারিয়া

জারিয়া থেকে রিক্সায় চেপে রওনা দিলাম দুর্গাপুরের দিকে। সকালের আলো তখন ধীরে ধীরে প্রকৃতিকে উন্মোচন করছে—মাঠ, গাছ, পথঘাট সব যেন রাতের ঘুম ভেঙে প্রসারিত হচ্ছে। গন্তব্যে পৌঁছে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল বিরাট আয়োজন। হাঁসের মাংস আর ছিটা রুটির সেই স্বাদ আজও ভুলিনি। পেটভরে খেয়ে ক্লান্ত শরীরটা ছেড়ে দিলাম ঘুমের কাছে। আজ শুধু বিশ্রামের দিন। বিকেলে শুরু হবে পাড়া ঘোরা—নতুন জায়গা, নতুন মানুষ আর অজানা গল্পের খোঁজে।

 

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ঘুম থেকে উঠে হালকা কিছু খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম আশপাশটা দেখব বলে। নেত্রকোনা  এমন এক জেলা—এত বড়, এত বৈচিত্র্যময় আর সৌন্দর্যে ভরপুর—যে এক-দু’দিনে দেখে শেষ করা সম্ভব নয়। ঢাকা থেকে প্রতিদিন নিয়মিত ট্রেন চলে, পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বাস সার্ভিসও রয়েছে নেত্রকোনাগামী।

 

মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই জেলা সমতল ভূমি, ছোট ছোট টিলা, হাওর ও বাওড়ের অপূর্ব মেলবন্ধন। ময়মনসিংহ বিভাগের এই অঞ্চলে বহু সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। এখানে বসবাস করে নানা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী—বিশেষ করে গারো জনগোষ্ঠী বেশি। পাশাপাশি হাজং, কোচ, দালুই ও মান্দাই জনগোষ্ঠীর উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য।

 

জেলার পাঁচটি উপজেলাজুড়ে ছড়িয়ে আছে প্রায় ৫৬টি হাওর ও ৬৪টি বিল। বর্ষা মৌসুমে খালিয়াজুড়ি এলাকাকে একেবারে দ্বীপ রাষ্ট্রের মতো মনে হয়। এছাড়াও মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা ও মদন উপজেলায় বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল রয়েছে। বর্ষাকালে ডিঙ্গাপোতা হাওরের বিস্তৃতি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটার। কংস ও ধনু নদী এসব হাওরের প্রাণস্রোত। তার সঙ্গে যোগ হয় মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অবিরাম বৃষ্টির জলধারা।

 

চারপাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট-বড় খাল ও জলপথ। প্রায় ৩০টির মতো গ্রাম এই জলভূমির বুকে ছড়িয়ে রয়েছে। এখানে মূলত দুটি মৌসুম—বর্ষা ও শুষ্ককাল। বর্ষা এলে হাওরের জীবন যেন নতুন করে জেগে ওঠে। এই সময় প্রায় সবাই মাছ ধরায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। স্বচ্ছ পানির নিচে লতাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে তৈরি হয় মাছের আদর্শ আবাস। চারদিকে শুধু মাছ আর মাছ। কত নাম, কত বৈচিত্র্য—ভুঁইড়া, মহাশোল, টাকি, বাঘা, লাচ্ছা, রাণী, সরপুঁটি, পাবদা, এলং, পাঙ্গাস, নানিদ, আইড়, চিতল, রুই, বাউস, গলদা চিংড়ি, বোয়াল, বাইন—তালিকা যেন শেষই হয় না। সঙ্গে দেখা মেলে শামুক-ঝিনুক আর শাপলা-শালুকের প্রাচুর্য। অতীতে এখানে পাওয়া যেত ছোট আকারের রঙিন এক প্রজাতির মাছ; যার স্বাদ ছিল অতুলনীয়। জেলেরা আদর করে একে ডাকত ‘রাণী ভবানী’ নামে।

 

বর্ষাকালে চলাচলের একমাত্র ভরসা ইঞ্জিনচালিত নৌকা। নদী ও বিলভেদে দেখা যায় ডিঙি, চালামা, করাইয়া, কুরি, বারকি, পানসি, পাথাম—হরেক রকম নৌকা। কোনো কোনো নৌকা থেকে ভেসে আসে জারি-সারি, বাউল, ভাটিয়ালি, তামসা কিংবা ঘাটু গানের সুর, যা বর্ষার নীরবতাকে আরও গভীর ও মায়াময় করে তোলে। এই মৌসুমে এখানে সেখানে গড়ে ওঠে অস্থায়ী হাঁসের খামার। তবে বর্ষার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো আকস্মিক পাহাড়ি পানির আগমন, যা মুহূর্তেই বদলে দেয় জীবনের ছন্দ।

 

বর্ষা শেষে জমি ভেসে উঠতে শুরু করলে চারদিকে জন্মায় প্রচুর চইল্লা ঘাস। শুষ্ক মৌসুমে চলাচলের প্রধান ভরসা তখন পায়ে হাঁটা পথ। কোথাও কোথাও ঘোড়া কিংবা সাইকেলে করে মালামাল বহন করতে দেখা যায়। ফাঁকে ফাঁকে চলে মোটরসাইকেল। মাঠে মাঠে শুরু হয় বোরো ধান রোপণের কর্মযজ্ঞ—ছেলে-বুড়ো সবাই কাজে নেমে পড়ে। অল্প সময়েই চারদিক সবুজে ছেয়ে যায়।

 

এ অঞ্চলে গাছের মধ্যে হিজল আর তালের আধিক্য বেশি। সঙ্গে রয়েছে নলখাগড়াসহ নানা জলজ উদ্ভিদ; যারা বাতাসে দুলে দুলে প্রকৃতিকে আরও জীবন্ত করে তোলে। তাদের ফাঁকে ফাঁকে আর পানির ওপর উড়ে বেড়ায় নানা প্রজাতির দেশি ও পরিযায়ী পাখি। ফাল্গুন-চৈত্র মাস এলেই শুরু হয় ধান কাটার মহাসমারোহ।ধান কাটা, শুকানো, খলা তৈরি ও মাড়াই একটানা চলতে থাকে। এই উৎসবে অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে দলে দলে আসে ‘ভাগালুয়া’রা। ভাগালুয়া হলো মৌসুমি ফসল কাটার দিনমজুর। এই দৃশ্য বড়ই ব্যতিক্রমধর্মী—নিজের চোখে না দেখলে এর সৌন্দর্য ও জীবনের স্বাদ বোঝা সত্যিই অসম্ভব। আমরা বিকেলে বের হয়ে দুর্গাপুর সদরের কাছেই  অনুপমা সোমেশ্বরী নদী দেখতে গিয়েছি।  দুর্গাপুর সদর থেকে ভ্যান কিংবা হেঁটে যাওয়া যায় নদীতে।

 

সোমেশ্বরী নদী পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা এক আবেগী স্রোত—যেন প্রকৃতি নিজেই তার অনুভূতিগুলো এই নদীর ভেতর ঢেলে দিয়েছে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড় থেকে জন্ম নিয়ে সোমেশ্বরী ছুটে আসে বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুরে। পাহাড়, টিলা আর পাথরের ফাঁক গলে তার দীর্ঘ যাত্রা—এই চলার মাঝেই গড়ে ওঠে তার অনন্য রূপ।

সোমেশ্বরী নদী

বছরের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সোমেশ্বরী ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়ে হাজির হয়। শীতে নদীর নীলচে স্বচ্ছ পানি রোদের আলোয় কখনো আকাশের রঙ ধারণ করে, কখনো পাহাড়ের সবুজ ছায়া মিশিয়ে নেয় নিজের বুকে। শুকনো মৌসুমে সে শান্ত, গভীর এক ধ্যানমগ্ন নারীর মতো—নীরব, কোমল, ধীর। নদীর তীরজুড়ে লালচে বালু আর গোল পাথরের সারি তখন তার সৌন্দর্যকে আরও নগ্ন করে তোলে।

 

সোমেশ্বরী নদীর টলটলে পানি দেখে মন ভরে গেল। জানা গেল, এর বালু বেশ কার্যকর দালানকোঠা নির্মাণে। এই শুষ্ক মৌসুমে নদীর বালুতে মিশে আছে কয়লা। সেই কয়লা তোলার কাজ শুরু হয় ভোর থেকেই। বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা, এক পাশে সরু ফালির মতো বয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা নদীটি। খেয়া পারাপার হচ্ছে অসংখ্য মানুষ।

 

কিন্তু বর্ষা এলে সোমেশ্বরী বদলে যায়। পাহাড়ি ঢল নামলে সে হয়ে ওঠে ভরা যৌবনা—প্রবল, উচ্ছ্বসিত, জীবন্ত। ঢেউয়ের গর্জনে শোনা যায় পাহাড়ের আহ্বান, স্রোতের তালে তালে নেচে ওঠে নদীর বুক। তখন তার জল শুধু পানি নয়, তা হয়ে ওঠে প্রাণের প্রবাহ, নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি।

 

সোমেশ্বরীর সঙ্গে দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা অঞ্চলের মানুষ, হাজং ও গারো জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, কৃষি আর সংস্কৃতি অদৃশ্য এক বন্ধনে জড়িয়ে আছে। শেষে সে কংস নদীর সাথে মিলিত হয়ে হারিয়ে যায় দূরের বিস্তৃত জলধারায়, কিন্তু রেখে যায় তার নীল স্মৃতি।

 

সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামতে চলেছে, তবু সোমেশ্বরী যেন আমাদের ছাড়তেই চাইছে না। সুযোগ পেলে এখানেই থেকে যেতাম আরও কিছুক্ষণ। কিন্তু অপরিচিত জায়গা, অচেনা রাত—বাধ্য হয়েই রওনা দিতে হলো। দুর্গাপুর লাল বালির জন্য বিখ্যাত। সন্ধ্যা নামতেই দেখা যায় সারি সারি ট্রাক বালি বোঝাই করে ছুটে চলেছে দেশের আনাচে-কানাচে। আমরাও শহর ঘুরে ধীরে ধীরে ঘরের পথে ফিরছি।

 

শহরের অলিগলিতে চোখে পড়ে পাহাড়ি আদিবাসীদের ছোট ছোট দোকান। কেউ বিক্রি করছে কোচে মাছ, কেউ ভারতীয় সাবান-শ্যাম্পু, আবার কোথাও নানান রকম কসমেটিকস ও পাহাড়ি পণ্য। আলো-আঁধারির মধ্যে এসব দোকান শহরের সন্ধ্যাকে অন্যরকম এক জীবনচিত্রে রাঙিয়ে তোলে।

পরদিন খুব ভোরে বের হয়েছি। আজকের পরিকল্পনা হলো এই অঞ্চলের সবচেয়ে সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো ঘুরে দেখা। পুরো দিন ঘুরার জন্য সবচেয়ে ভালো হয় যদি একটি বাইক ভাড়া নেওয়া যায়। সবগুলো দর্শনীয় স্থানে যেতে হলে দু-একবার ছোট নৌ-ফেরি পার হতে হবে, তাই বাইকই এখানে সবচেয়ে সুবিধাজনক বাহন। চাইলে ভেঙে ভেঙে অটোতেও যাওয়া যায়। আর যারা প্রকৃতিকে ধীরে ধীরে উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য এই রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে ঘুরাটাই হতে পারে জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা।

আমরা দু’জন ছিলাম বলে বাইক নেওয়াটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক মনে হয়েছে। বিরিশিরি বাজার থেকে সারাদিনের জন্য বাইক নিয়ে বের হওয়ার আগে চাইলে ঘুরে নিতে পারেন বিরিশিরির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি।

বিরিশিরির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি

এই অঞ্চলে বসবাসকারী গারো, বানাই, হাজং, দালু, কোচ ও মান্দাই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত বহু নিদর্শন এখানে সংরক্ষিত আছে। তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রাচীন, বৈচিত্র্যময় ও অত্যন্ত মনোগ্রাহী। আদিকাল থেকেই স্থানীয় সহযোগিতার মাধ্যমে এসব জনগোষ্ঠী নিজেদের সংস্কৃতি লালন ও সংরক্ষণ করে আসছে। [বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।]

 

বিরিশিরি বাজারে বেসরকারিভাবে পরিচালিত কয়েকটি কটেজ রয়েছে। এছাড়াও YMCA নামে একটি ট্রেনিং সেন্টার আছে—চাইলে যেকোনো একটিতে রাত কাটানো যেতে পারে। বিরিশিরি থেকে বাইক বা অটো নিয়ে ঘাটের দিকে যেতে হবে। ঘাট পার হলেই আমাদের পরবর্তী গন্তব্য—রানীখং মিশন।

রানীখং টিলা ও এর ওপর নির্মিত শতবর্ষী রানীখং মিশন সোমেশ্বরী নদীর কূল ঘেঁষে অবস্থিত। এই মিশনকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে একটি ক্যাথলিক ধর্মপল্লী, যা স্থানীয়ভাবে ‘সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী’ নামে পরিচিত। ভারত সীমান্ত ঘেঁষে নান্দনিক কারুকাজে নির্মিত এই ক্যাথলিক মিশনটি এক অনন্য দর্শনীয় স্থান।

সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী

টিলার ওপর দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে চোখে পড়ে সোমেশ্বরী নদীর শান্ত অথচ বহমান স্রোত, আর ওপারে মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়শ্রেণি। এই দৃশ্য যে কাউকে মুহূর্তেই মুগ্ধ করে। চার্চের ভেতরে একটি স্কুল রয়েছে। চারদিকে সবুজে মোড়া, স্নিগ্ধ ও শান্ত পরিবেশ চার্চটির ভাবগাম্ভীর্য ও পবিত্রতাকে আরও গভীরভাবে অনুভব করায়।

সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী

চার্চ থেকে বের হয়ে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্প। সবুজে ঘেরা মনোরম রাস্তা ধরে বাইক নিয়ে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় ক্যাম্প এলাকায়। ক্যাম্পের পাশে ছোট একটি টিলায় কমলার বাগান রয়েছে—সময় থাকলে ঘুরে আসতে পারেন। সোমেশ্বরী নদীর কূল ঘেঁষে ক্যাম্প এলাকাতেও নদীর রূপ ভিন্নভাবে ধরা দেয়।

কমলার বাগান

অনুমতি নিয়ে এরপর যেতে হবে বিজয়পুর জিরো পয়েন্টে—এটাই আমাদের মূল গন্তব্য।

এটি বাংলাদেশের এক আজব রাস্তা। রাস্তার দুই পাশে ভারত, আর মাঝখানের সরু পথটুকুই বাংলাদেশের। এক পাশে সোমেশ্বরী নদী, অন্য পাশে সবুজে ঢাকা পাহাড়—এত সৌন্দর্যে ভরপুর রাস্তা খুব কমই দেখেছি। এখানে ঘোরাঘুরির সময় বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, কারণ এটি একদম সীমান্ত ঘেঁষা এলাকা। যেকোনো সময় সীমান্তরক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হতে পারে।

বিজয়পুর জিরো পয়েন্টে

 

বিজয়পুর জিরো পয়েন্ট থেকে আমাদের পরের গন্তব্য বিখ্যাত চিনামাটির পাহাড়। বাইক থাকায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া খুব সহজ ও দ্রুত হয়েছে।

বিজয়পুরে অবস্থিত বাংলাদেশের একমাত্র চিনামাটির পাহাড়। বিজয়পুরের সাদামাটির পাহাড় মূলত টারশিয়ারি যুগের। ১৯৫৭ সালে ভূতাত্ত্বিক জরিপে এখানে সাদামাটির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালে বিজয়পুরের সাদামাটি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

চিনামাটির পাহাড়

পাহাড়ের কেটে যাওয়া অংশজুড়ে ঝকঝকে সাদা মাটি, আর তার পাশেই নীলচে স্বচ্ছ পানির লেক—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব নয়নাভিরাম দৃশ্য। সূর্যের আলো পড়লে পাহাড়ের সাদা রঙ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই এখানে তার বিশুদ্ধতম ক্যানভাস মেলে ধরেছে। একসময় এখানে শুধু চিনামাটি উত্তোলনই হতো, কিন্তু ধীরে ধীরে প্রকৃতির এই অনন্য সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মানুষ এখানে ছুটে আসতে শুরু করে। এখন প্রতি বছর দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক এই জায়গাটি দেখতে আসেন।

চিনামাটির পাহাড়

এই এলাকাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু দোকানপাট, যেখানে ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হয়। চিনামাটির পাহাড় ঘুরে বের হওয়ার পথে চোখে পড়বে রাসিমণি হাজং-এর স্মৃতিসৌধ।

 

রাসিমণি হাজং (১৯০১–৩১জানুয়ারি, ১৯৪৬) ছিলেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক টঙ্ক আন্দোলনের অন্যতম সাহসী নেত্রী এবং এই আন্দোলনের প্রথম নারী শহিদ। ব্রিটিশ শাসনামলে তৎকালীন জমিদারদের শোষণমূলক ‘টঙ্ক’ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি হাজং জনগোষ্ঠীর নারীদের সংগঠিত করে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

হাজং-এর স্মৃতিসৌধ

টঙ্ক প্রথা ছিল কৃষকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক খাজনা আদায়ের এক নিষ্ঠুর ব্যবস্থা, যা কৃষক সমাজকে চরম দারিদ্র্য ও নিপীড়নের দিকে ঠেলে দেয়। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাসিমণি হাজং নির্ভীক নেতৃত্ব দেন। বিশেষ করে নারী কৃষকদের আন্দোলনে যুক্ত করে তিনি এই সংগ্রামকে নতুন মাত্রা দেন।

১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি, মাত্র ৪৫ বছর বয়সে পুলিশের গুলিতে তিনি শহিদ হন। তাঁর মৃত্যু  স্থানীয় কৃষক আন্দোলনকে আরও দৃঢ় ও সংগঠিত করে তোলে। আজও রাসিমণি হাজং শোষণবিরোধী সংগ্রাম, নারী নেতৃত্ব ও কৃষক অধিকার আন্দোলনের এক অনন্য প্রতীক হয়ে আছেন।

 

বিজয়পুর থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য  লেঙ্গুড়া। কলমাকান্দা উপজেলার ভারত সীমান্ত সংলগ্ন গণেশ্বরী নদীর পাশ ঘেঁষে অবস্থিত লেঙ্গুরা টিলাটি যেন প্রকৃতির নিপুণ হাতে সাজানো একটি বাগান। সমতল থেকে অনেক উঁচু এই টিলায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় ভারতের সীমানায় অবস্থিত পাহাড় রাজ্য, বন-বনানী, ঝরনার মতো নেমে আসা চঞ্চলা নদীসহ আরো অনেক কিছু। এর কাছেই গারো, হাজংদের বৈচিত্র্যময় বসবাস। টিলার পাশে হাজংদের একটি মন্দির আছে। টিলার উপর একটা পাথর আছে চাইলে বসে গণেশ্বরী নদীর সৌন্দর্য দেখতে পারেন।

লেঙ্গুড়া

লেঙ্গুড়া থেকে বাইক নিয়ে বর্তমান সময়ে মানুষের মুখে মুখে রচিত পাঁচগাও বর্ডারে যাচ্ছি। বাইকে মিনেট ত্রিশেকের পথ।  কলমাকান্দা থেকে মধ্যনগরের যাবার পথেই পাঁচগাও।

 

ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই পাঁচগাও যেন কুয়াশার নরম চাদরে নিজেকে মুড়ে নেয়। দূরে মেঘালয়ের পাহাড়গুলো স্থির দাঁড়িয়ে থাকে—গম্ভীর, রহস্যময়, সময়ের প্রাচীন প্রহরীর মতো।  এখানকার ধানক্ষেতগুলো মনে হয় মাটির বুকে সবুজ কিংবা ধূসর সমুদ্র খেলছে।  লালচে মাটির সরু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ শোনা যায় পাখির কিচিরমিচির ।

 

বর্ষায় পাঁচগাও সৌন্দর্য নতুন রুপ নিয়ে সামনে আসে সরু মাটির পথ  পেরিয়ে কাছে গেলেই দেখা মেলে ছোট্ট এক ঝর্ণার—পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা সরু জলধারা। খুব বড় নয়, কিন্তু তার শব্দে আছে এক অদ্ভুত শান্তি। স্বচ্ছ পানির ফোঁটা পাথরে আছড়ে পড়ে রূপালি ছিটা তোলে, চারপাশে ভিজে মাটির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

 

সন্ধ্যা নামলে পাহাড়গুলো নীলচে অন্ধকারে ঢেকে যায়, আর ঝর্ণার কলকল ধ্বনি তখন আরও স্পষ্ট শোনা যায়। পাঁচগাও তখন নিঃশব্দ এক স্বপ্নরাজ্য। বর্তমানে একদম বর্ডার ঘেষে বেশ রমরমা ব্যবসা চলছে ভারতীয় বিভিন্ন পন্য নিয়ে। বেশ কিছু দোকান আছে।

 

পাঁচগাও থেকে বিরিশিরি হয়ে নেত্রোকোনা শহরে ফিরতে পারেন। কিংবা বিরিশিরি এসে থাকতে পারেন।আমরা বিরিসিরি আত্মীয়ের বাড়িতে এসে আরো কয়েকদিন থেকে ফিরেছি।  আপনারা চাইলে নেত্রোকোনা শহরে ফিরে একদিন থেকে আরো কিছু দর্শনীয় জায়গায় যেতে পারেন।

 

সদরে আসলে দেখা মিলবে নেত্রকোণার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘গয়ানাথের বালিশ মিষ্টি’ একটি জিআই (GI) পণ্য, যা দেখতে কোল বালিশের মতো এবং ওজনে বেশ ভারী (এক থেকে দুই কেজি পর্যন্ত হতে পারে) । গয়ানাথ ঘোষের নামে পরিচিত এই মিষ্টি দুধের ছানা, চিনি ও ময়দা দিয়ে তৈরি হয়ে থাকে । এর ওপরে ঘন ক্ষীরের প্রলেপ দেওয়া থাকে এটি  খেতে ভুলবেন না।  নেত্রোকোনা সদরে অনেক গুলো আবাসিক হোটেল আছে চাইলে এখানে থেকে পরদিন ঘুরতে বের হতে পারেন।

গয়ানাথের বালিশ মিষ্টি

কবি-সাহিত্যিকদের বাড়িতে যাঁদের ঘুরাঘুরি করার অভ্যাস, তারা আসতে পারেন নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলায় অবস্থিত কাশবন গ্রামে কবি নির্মলেন্দু গুণের বাড়িতে।

বারহাট্টা

কবির গ্রামটি বাংলাদেশের অন্যান্য গ্রামের মতোই সবুজ-শ্যামল, শান্ত ও কোলাহলমুক্ত। মূল ভিটায় টিনশেড বসতঘর। চারপাশে রয়েছে সুপারি, আম, নারকেলসহ বিভিন্ন গাছ। সামনে রয়েছে রামসুন্দর পাঠাগার। খুব একটা বড় নয়। বিভিন্ন ধরনের বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে সেখানে।

 

পাঠাগারের সামনে ও পেছনে কবির নিজ উদ্যোগে শান বাঁধানো ঘাটসহ খনন করা ‘সুখেন্দু সরোবর’ ও ‘কামিনী সরোবর’ নামে দুটি স্বচ্ছ পানির পুকুর রয়েছে।  বাড়ির পাশেই আছে বিদ্যানিকেতন। রয়েছে নজরুল, রবীন্দ্রনাথসহ বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য এবং মঞ্চ। বাড়ির মধ্যে রয়েছে মা ও সৎমায়ের নামকরণে করা বীণাপাণি-চারুবালা সংগ্রহশালা।এটি মার্বেল পাথর আর পোড়ামাটির টাইলস দিয়ে তৈরি। সেখানে দেখা মিলবে বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি, কবির পুরস্কারের ক্রেস্ট, সনদ, চিঠি, উপহারসামগ্রী, পরিবারের সদস্যদের নানা স্মৃতি, দেশের ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শনসহ আরও অনেক কিছু। তা ছাড়া দেখা মিলবে দাদা-বাবার নামে করা সারদা-বাসুদেব চিত্রশালা, যেখানে গ্রামের ছোট ছেলেমেয়েরা বিনা পয়সায় শিখছে চিত্র আঁকা। সংগীতের জন্য রয়েছে শৈলজা সংগীত ভবন।

রফিজের চায়ের দোকানে

কাশবন থেকে বের হয়ে বারহাট্টা স্টেশনে যেতে পারেন কবির বিখ্যাত হুলিয়া কবিতার রফিজের চায়ের দোকানের খোঁজে।   কিংবা নেত্রকোনা হয়ে কেন্দুয়া আসতে পারেন রোয়েল বাড়ি দুর্গ দেখতে।

রফিজের চায়ের দোকানে

স্থানীয় ইতিহাসে আছে, মোঘল আমলে সুলতান হুসেন শাহ, নুসরত শাহ ও পরবর্তীতে ঈসা খাঁ এই দুর্গ থেকেই বাংলার ভাটি অঞ্চল শাসন করতেন। দুর্গটিতে বহুকক্ষ বিশিষ্ট একাধিক উঁচু ইমারতের চিহ্ন, দুটি পরিখা,দুর্গ থেকে বের হওয়ার সুড়ঙ্গপথসহ অসংখ্য প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে। প্রতিটি ইমারতের গায়ে রয়েছে লতাপাতা ও ফুলের টেরাকোটা। এছাড়াও দুর্গ এলাকায় দুটি পুকুর ও বেশি কিছু উঁচু স্থান রয়েছে।

রোয়েল বাড়ি দুর্গ

বর্তমানে পুরো দুর্গটি প্রায় মাটির নিচে আছে। উপরে কিছুটা ভাসমান রয়েছে।  দুর্গ থেকে কাছেই হুমায়ূন আহমদের বাড়ি ও নিজ হাতে গড়া শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ। এছাড়াও কেন্দুয়া থেকে কাছেই মদন উপজেলায় মিনি কক্সবাজার খ্যাত উচিতপুর থেকে ঘুরে আসতে পারেন সময় নিয়ে।

সাইঢুলী নদী

পাঠকের সুবির্ধাতে পুরো রোড ম্যাপটা সংক্ষেপে সাজিয়ে দিচ্ছি।  প্রথম দিন রাতেই রওনা দিয়ে সরাসরি বিরিশিরি পৌঁছে বাইক নিয়ে দুর্গাপুরের বিজয়পুর,চিনামাটির পাহাড়, সোমেশ্বরী নদী, কলমাকান্দা লেঙ্গুড়া ঘুরে নেত্রকোনা সদরে এসে গয়ানাথের মিষ্টি খেয়ে, পরদিন বারাহাট্টা কেন্দুয়া ঘুরতে পারেন কিংবা বর্ষা হলে পরদিন হাওরে ঘুরতে পারেন।

 

জীবন ছোট সময় পেলেই বের হয়ে যান পৃথিবীর পথে।  কবে হুট করে দেখবেন আপনার শেষ দিন চলে এসেছে । তাই দুঃখ পাইতে হলে এখনি পান, উপভোগ করতে হলে এখনি করুন। জীবন সুন্দর।

 

বিঃদ্রঃ ঘুরতে গিয়ে কোথাও ময়লা ফেলবেন না এবং স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করুন।

 

 

ফেব্রুয়ারি ২০১৬

{{ reviewsTotal }}{{ options.labels.singularReviewCountLabel }}
{{ reviewsTotal }}{{ options.labels.pluralReviewCountLabel }}
{{ options.labels.newReviewButton }}
{{ userData.canReview.message }}

Hi, I'm Rafa

Welcome to my world of exploration! I’m a passionate travel blogger from Bangladesh, dedicated to showcasing the incredible beauty and rich culture of my homeland.

Find us on Facebook