অরণ্যের দিন-রাত্রিতে জয়পুরহাট
আলতাদিঘীর অরণ্যের ভেতর দিয়ে হিরো স্প্লেন্ডার “রাজশহী হ- ৩২- ৩৮৫১ ” এই নাম্বারের গাড়িটি ছুটে চলছে। গাড়ির আওয়াজ’টা ভালো লাগছে না এখন একদম সুনসান নিরবতা দরকার! অরণ্য যত নিরব থাকবে তত সুন্দর থাকবে। জন অরণ্যে পরিনত হলেই সমস্যা। এই অরণ্য থেকে আসতে মন চাইছিল না। আমি বাইকের একদম পিছনের সিটে বসে শাল,সেগুন,কর্পূর গাছ দেখতে দেখতে যাচ্ছি। ভেতরটা কেমন শুন্য লাগছে। কি জানি হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে মনে হচ্ছে। ফাল্গুনের সন্ধ্যায় তৈরী হওয়া এই শুন্যতা নিয়ে জয়পুরহাট যাচ্ছি।
অরণ্য আর পাহাড় আমাকে টানে মায়ায় আবদ্য করে রাখে। অরণ্যের ভাষা বুঝতে পারলে আপনি জীবনভর থাকতে চাইবেন সেখানে। শুক্লাপক্ষের সপ্তমী বা অষ্টমী হবে হয়তো চাঁদের কিঞ্চিৎ আলো বেশ মোলায়েম পরিবেশ তৈরী করেছে। রাস্তার দু’ধারে প্রচুর কলা গাছের ছায়া রাস্তায় এসে পড়েছে। শুন্যতা যে কেন তৈরী হয় বুঝি না প্রকৃতি শুন্যস্থান পছন্দ করে না কোন না কোন ভাবে সেটা ভরিয়ে দিবেই। আমরা চলে এসেছি এক ভাইয়ের বাসায়। গতকাল নওগাঁ গিয়েছিলো ভাইয়া আমাদের আনতে।
ভাইয়ার বাসায় পৌঁছেই মনে হল, এই এক অদ্ভুত শান্তি ভরিয়ে দিয়েছে পরিবেশ। আসলে মানুষ, যাই হোক, প্রকৃতির মতোই শুন্যতার ভেতর জায়গা খুঁজে নেয়। ভাইয়ার বাসায় ঢুকতেই যেন এক চিরন্তন বন্ধুত্বের আদর ঢুকে পড়ল। আন্টির মুখের হাসি প্রকৃতির রূপের মতো স্নিগ্ধ। জানতাম প্রকৃতি শুন্যতা পছন্দ করে না। তাই এই রুপ।

আজকে চেষ্টা করেও সকালে বের হতে পারি নি। আন্টি রান্নার আয়োজন করেছেন না খেয়ে কোন ভাবেই বের হওয়া যাবে না। আমাদের দিন ছোট হয়ে গেছে তবে আন্টির আদরের কাছে এসব কিছুই না বার বার বলছেন ঘুরতে ঘুরতে চোখ নিচে কালো হয়ে গেছে কত কি। আমার শুধু ভালো মানুষের সাথে পরিচয়! দুনিয়ায় ভালো মানুষ বেশি।

বাসা থেকে বের হয়ে আমাদের প্রথম যাত্রা বারো শিবালয়। বারোটি শিব মন্দির একসাথে। পৃথিবীতে আরো বড় বড় শিব মন্দির আছে তবে ১২ টি মন্দির একসাথে নেই। বারো শিবালয়ের সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হয় যে রাজা বল্লাল সেন শিবের উপাসক ছিলেন বলে তিনি এই মন্দির স্থাপন করেন।

আবার কারো কারো মতে, ইতিহাস পরিচিত জগৎ শেঠের মতো বিত্তবান ছিলেন রাজীব লোচন মন্ডল নামে এক ধনাঢ্য ব্যক্তি।তিনি ছিলেন ধার্মিক কায়েস্থ । যিনি ১৭০০ সালে বারো শিবালয় মন্দিরটি নির্মাণ করেন। বেলআমলা হতে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য মতে এবং সেখান থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন প্রকার চন্ডীমূর্তি, সূর্যমূর্তি, বাসুদেবমুর্তি দেখে ধারণা করা হয় এককালে এখানে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মাবলীম্বদেরও তীর্থস্থান ছিল। রাজীব লোচন মন্ডলের বংশের অধস্তন জ্ঞানেদ্রনাথ চৌধুরী একসময় এখানকার বিশাল জমিদারির মালিক ছিলেন। পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক জমিদারি নিলামে উঠার পর থেকে বেলআমলা গ্রামে জমিদারির পতন হয়। পর্যায়ক্রমে গতিনাথ দত্ত চৈধুরী ও তার পুত্র গিরীলাল দত্ত চৌধুরীর সময় জমিদারি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

কয়েকদিন পরে বিশাল মেলা। প্রতিবছর ফাগুন মাসের চতুর্দশীতে শিবরাত্রি এ বারো শিবালয় কে ঘিরে পূজা অর্চনা আয়োজিত হয়। শিবরাত্র উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল মেলা। মেলায় মানত, শিবদর্শন, গীতা পাঠ, উলুধ্বণি আর ঐতিহ্যবাহী ঢাক ঢোলের বাজনায় সারা এলাকা মুখরিত হয়। এছাড়া মেলায় দেশের সুখ-সমৃদ্ধি ও মানব কল্যাণে শিবঠাকুর কে সন্তুষ্ট করতে আলো আধারির মাঝে কীর্তন গানের অনুষ্ঠান করা হয়। মেলায় শাখা-সিদূর, পৈতা, তিলক, পুতির মালা, কাঠের জালি, পুতুল, খেলনা, ঘর সাজানোর সামগ্রী, মাটির হাঁড়ি-পাতিল, বাঁশের তৈজসপত্র, রঙিন চুড়ি, হস্তশিল্পের নকশাদার ব্যাগ, কাঠের খেলনা, ঝিনুকের গয়না এবং বাহারি আসবাবপত্রের কেনাবেচা বেশ জমে ওঠে।
কয়েকদিন পর আসলে মেলাটা উপভোগ করতে পারতাম। জয়পুরহাট শহর থেকে অটো রিকাসা বা ভ্যান নিয়ে যেতে পারেন। আমরা বাইক নিয়ে যাচ্ছি। ৩/৪ কিলোমিটার রাস্তা শহর থেকে কাছেই। জয়পুরহাঁট শহরের সদর রোড আর পঁচুর মোড় বেশ কয়েকটা হোটেল আছে চাইলে এসে থাকতে পারেন। আর একটু গুগুলে সার্চ করলেই জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর ফোন নাম্বার পেয়ে যাবেন। খালি থাকা সাপেক্ষে রাত্রিযাপন করতে পারবেন।
জয়পুরহাট জেলার অর্থনীতি সম্পূর্ণরূপে কৃষি নির্ভর। জয়পুরহাট উত্তরাঞ্চলের শস্যভান্ডার খ্যাত। এখানকার মৃৎ শিল্পের কাজ এখন বিলুপ্তির পথে। জয়পুরহাট চিনিকল বাংলাদেশের বৃহৎ চিনিকল। জামালগঞ্জ কয়লা খনি দেশের বৃৃহত্তম কয়লা খনি।

আমাদের পরের গন্তব্য পাঁচবিবি উপজেলায়। লাকমা রাজবাড়ি। জয়পুরহাট সদর কিংবা বারোশিবালয় থেকে পাঁচবিবি উপজেলায় সি এন জি তে যেতে পারেন। পাঁচবিবি থেকে কড়িয়া গ্রামে অটো বা ভ্যানে যেতে পারেন। খুব বেশি সময় লাগবে না।
জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার পশ্চিম কড়িয়া গ্রামে ঐতিহাসিক লকমা রাজবাড়ি অবস্থিত । বাড়িটি বর্তমানে লকমা চৌধুরীর পরনাতীসহ উত্তরাধিকারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সমিতি দেখাশুনা করে। বাড়িটি প্রায় ২০০-৩০০ বছর পূর্বে নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় লোকজন জানান, দালান গুলো একটি ঘোড়াশাল এবং অপরটি হাতীশাল ছিল। তার একটু সামনে মাটির একটি ঢিবি রয়েছে যেখানে ইউ আকৃতির বহু পুরাতন দ্বিতল ভবনের অবস্থান । জনশ্রুতি আছে যে, ভবনের কিছু অংশ মাটির নীচে ডেবে গেছে । লকমা রাজবাড়ির পূর্ব পার্শ্বে কবরস্থান ও কর্মচারীদের ঘর রয়েছে। এখনও প্রতিদিন অনেক লোক স্বচক্ষে রাজবাড়িঢি দেখার জন্য আসে।

ঠিক কত সালে নির্মান হয়েছে তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়নি। অনেকের মতে, বাড়িটি ১৩ শতকে লক্ষণ সেনের আমলের। আবার অনেকে বলেন, চৌধুরী হাদী মামুন নামের কোন এক ব্যক্তি আড়াইশ বছর আগে বাড়িটি নির্মান করেন। পুরো বাংলাদেশে সীমান্ত ঘেষে তেমন কোন রাজবাড়ী নেই এটা ছাড়া। বর্ডার থেকে এই রাজবাড়ি ৫০ থেকে ১০০ গজ দূরে, বাড়িটির অস্তিত্ব প্রায় শেষ দিকে দ্রুত এটি সংরক্ষণ করা দরকার।
সময় থাকলে এখান থেকে হিলি বন্দরে যেতে পারেন আমি কয়েকদিন আগে দিনাজপুর থেকে গিয়েছিলাম। পাঁচবিবি থেকে মিনেট বিশেকের পথ। দুপুর প্রায় শেষের দিকে আন্টি বার বার বলে দিয়েছিলেন দুপুরে খেয়ে তারপর জয়পুরহাট থেকে বগুড়া যেতে। আমাদের আজকে রাতের গন্তব্য বগুড়া। পাঁচবিবি থেকে জয়পুরহাট এসে আবার আন্টির আথেতিয়তা নিলাম। মায়েরা সব এমনি হয়। সন্তানদের শান্তি মত খেতে দেখলেই উনারা খুশি। আমার হুট করে বগুড়া যেতে মন চাচ্ছে না । আমি একটু সায় দিলেই আজকে রাতে আর জয়পুরহাট ছাড়তে পারতাম না। হুমায়ূন আহমেদের একটা কথা আছে” মায়া বড্ড খারাপ জিনিস “
মায়া কাটিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছি। পরের গন্তব্য হিন্দ কসবা মসজিদ ক্ষেতলাল উপজেলা। বাইক থাকায় আজ দেরী করে বের হয়েও সময় নিয়ে তেমন চাপে পড়তে হয়নি। জয়পুরহাটে ইতিহাসখ্যাত মিষ্টি আছে হাড়িভাঙা ও দুধকুমড়ী অবশ্যই খেয়ে আসতে হবে। চিনিকল রোড,রেলগেইট এর দিকে পাবেন।

জয়পুরহাট শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে ক্ষেতলাল উপজেলার বড়াইল ইউনিয়নের হিন্দা গ্রামে এ মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদটির কাচ, চিনামাটির টুকরা ও মোজাইক করা দেয়ালে রয়েছে বিভিন্ন রকম নকশা যা মোগল স্থাপত্য শিল্পের অনুকরণে করা হয়েছে।

বাংলা ১৩৬৫ সালে বাগমারী পীর হিসাবে পরিচিত চিশতিয়া তরিকার অন্যতম পীর হযরত আব্দুল গফুর চিশতীর (রহ) নির্দেশে মাওলানা আব্দুল খালেক চিশতি আমলে তারই তত্ত্বাবধানে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। হযরত আব্দুল কাদের নিজেই এর নকশা তৈরি ও ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।
হিন্দ কসবা মসজিদের পাশে আরো দুটি ঐতিহাসিক জায়গা আছে আমরা সময়ের অভাবে যেতে পারি নি।তার মাঝে একটা হলো আছরাঙ্গা দিঘী।জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার মামুদপুর ইউনিয়নে অবস্থিত আছরাঙ্গা দিঘী একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জলাশয়। ধারণা করা হয়, নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (প্রায় ৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে) রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের আদি রাজবংশের জমিদার মৌন ভট্ট কৃষি জমির সেচের উদ্দেশ্যে প্রায় ২৬ একর আয়তনের এই দিঘীটি খনন করেন। হিন্দ কসবা মসজিদ থেকে ২৫/৩০ মিনিট দুরত্বে এই আছরাঙ্গা দিঘী। ভ্যান বা অটোরিক্সা কে বললেই নিয়ে যাবে।
এরপরের গন্তব্য আছরাঙ্গা দিঘী থেকে কাছেই গোপীনাথের মন্দির। গোপীনাথপুর মন্দিরের ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো। প্রভুপাদ অদ্বৈত গোস্বামীর শিষ্যরা এটি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলার সুলতান আলাউদ্দীন হুসেন শাহ মন্দিরের জন্য তাম্রলিপিতে জমি দান করেন। ধারণা করা হয়, পাল যুগের স্থাপত্যশৈলীতে এটি নির্মিত হয়েছিল। গোপিনাথের মন্দির থেকে বগুড়া কিংবা জয়পুরহাট পৌছে আপনার পরের গন্তব্য ঠিক করতে পারেন।
জয়পুরহাট থেকে চলে যাচ্ছি। ক্ষেতলাল বাজার থেকে সি এন জি যায় বগুড়া। রাতে বগুড়ায় আমাদের আরেক বড় ভাইয়ের এখানে থাকবো। রাত হয়ে গেছে। এই রকম বাজেট ট্রিপে কোথাও ফ্রি থাকতে পারাটা বড় পাওয়া। সি এন জিতে বসে ঝিমুনি চলে আসছিল মোটামুটি লম্বা পথ। চোখ বুজলেই অরণ্য চোখে ভাসছে। মনে হচ্ছে আমি হাঁটছি।
বনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় এক অদ্ভুত জগতে চলে এসেছি। যেখানে কেবল গাছের ফিসফাস। বাতাসের মৃদু শিষ আর দূরে কোথাও বয়ে চলা নদীর কলকল ধ্বনি। এই নিস্তব্ধতার মধ্যেও যেন প্রকৃতি নিজের ভাষায় কথা বলে যাচ্ছে। শাল আর সেগুনের গন্ধমাখা বাতাস এসে মোহময় পরিবেশ তৈরী করে যাচ্ছে। আমি হাঁটছি তখন সেগুন গাছের একটা পাতা আমার সামনে পড়ে ছোট করে আওয়াজ দিল এই বন থেকে চলে যাও তোমাদের পদচারনায় আমাদের বাচ্চারা মরে যাচ্ছে।
কর্কশ হর্নে চোখের পাতা খুলে গেছে বুঝলাম স্বপ্ন দেখলাম, জীবন্ত এবং সত্য স্বপ্ন আমাদের পদচারনায় জঙ্গল ফুরিয়ে যাচ্ছে। শাল সেগুনের বাচ্চাদের আমরা খুন করছি!
শাল, সেগুন, নাগকেশর, কর্পুর, আর আমের বৃক্ষরা হাঁত উঁচিয়ে বলছে এভাবে বৃক্ষনিধন করো না। বৃক্ষদের বাঁচতে দাও তোমরা।
হে ইশ্বর মানুষের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করুন!
বিঃদ্রঃ ঘুরতে গিয়ে কোথাও ময়লা ফেলবেন না এবং স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করুন।
ফেব্রুয়ারি ২০১৯
